শাহানা জেসমিন এর কবিতা

244

আইভিলতা নীল খামের

কিংবদন্তী কাশ্মীরা সময় বয়ে চলে,ইরাবতী নদীর জলে…একটা স্বপ্নের ভোর ভেতরে জন্মে
আমিও তখন নতুন করে জন্ম নেই মায়াবতী সময়ে
কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ উঠে আমলকী বনে!
ভেসে যায় গুলবাহারী সুঘ্রাণে……
কচি রোদে ভরে যায় কোহিনুর ফসলের মাঠ
কাহারবা তালে গান গেয়ে যায় অরবিন্দ পাখিরা।

ধুপদানীতে অশোক ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে
আমার ভেতরে সুখ বেদপাঠ করে যুদ্ধিষ্ঠির এক অস্তিত্ব
সে প্রায়শঃই সপ্তর্ষিমণ্ডলে গেঁথে দিয়ে যায় গোপন পত্র !
তখন পারিজাত আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে পাপিয়া বনে।

আমাকে লেখা তোমার গোপন ক্ষুদ্র পত্রগুলো…
গচ্ছিত থাকে হৃদয়ে আবৃত তস্তরিতে!
জেনো আমরা দাঁড়িয়ে থাকি আলাদা দুমুঠো গার্হস্থ্য জীবনের জলপাইগুড়ি বৃষ্টিতে!
অথচ চোখ বন্ধ করে হেঁটে হেঁটে যাই তোমার সাথে
ভীর আর জ্যাম ঠেলে ঠেলে এলিফ্যান্ট রোডে।

আমার চোখ ক্রমশই গড়িয়ে যায় সেই পুরাতন হলুদ গাঁদাফুল রঙের ডাকঘরের দিকে..
তখন নির্বাচিত দেয়াল সীমানা অতিক্রম করে যায়
নীম ফুল রঙের ভরত অশোক পাখিরা!
প্লেটোনিক সুরে উচ্চাঙ্গসংগীত গায় কুয়াশার পর্দা সরিয়ে জানালার ওপাশে বিপাশা বৃক্ষের ডালে।

আর আমি তখনো অপেক্ষা করি তোমার পাঠানো
গোলাবী কুমকুম গন্ধে ভরা আইভিলতা নীল খামের।
একটা উঁচু দেয়াল আমাদের চারপাশে ঘিরে রাখে।

০২
একটা নীল রঙের ডায়েরি

একটা নীল রঙের ডায়েরি দিয়েছিলে আমাকে
সেদিন আকাশ ছিল বেদনা রঙ নীল
এতোদিনে ডায়েরির পাতাগুলো অনেকটাই ভঙুর হয়ে গেছে জানো প্রিয়!
অনেকগুলো জায়গায় ঝাপসা কষ্ট করে পড়তে হয়!
মাঝের কিছু পাতা বিবর্ণ হয়ে গেছে আর শব্দগুলো একেবারেই ঘোলাটে দেখি। এতো যত্নে থাকার পরও।

কিছু কথা পাঠোদ্ধার করতে পারি না
ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে প্রতি মোহনীয় পূর্ণিমার জ্যোৎস্নার ঝরঝরে আলোয় দেখি,পড়ার চেষ্টা করি!
বার বার পড়তে ইচ্ছে করে তোমার হাতের লিখার স্পর্শ নিপাট ভালোবাসায় জড়ানো আহা!

একদিন নদী হয়ে গেলে, ভেসে গেলে অচেনা হলে
আজও নদী ডাকি,আকাশ ডাকি তোমায়!
অথচ তুমি আর আমি একসঙ্গে হেঁটেছি…
একই মৃত্তিকায় সমান্তরালে,আমাদের পদচিহ্ন এখনো আছে মৃত্তিকার চুম্বনে!
কোন এক শ্রাবণের বাতাসে,কদমের ঘ্রাণে
তোমার শরীরের ঘ্রাণ মিশে আছে আজও!

তোমার নীল ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠা এখনও স্পষ্ট
কী সুন্দর করেই লিখেছো কবিতার কতগুলো লাইন…
কবি মাসুদ পথিকের আশ্চর্য কবিতার কতগুলো লাইন
“শ্রী পলা মজুমদার “একেবারেই অক্ষত আছে!
” জেনো স্মিতাকে বলেছি গল্পটির ছাইচাপা অংশ টুকু”
আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে, স্মিতা কে?
“পলা আমি ঠিক একদিন পাখি হবোই খোয়াই ‘য়ের আকাশে
তোমার ছেড়ে যাওয়া ছারা বাড়ির কামিনী ডালের সেই পাখি
উড়বো সেদিন সাবলীল,কোন কাঁটাতারই হবে না বাধা
আর আহত ডানা থেকে ঝরবে যতো সব স্মৃতির রেশম
তোমার চোখের জল মিশে যাওয়া বাতাসের দু পা’ড়ে।”

কী আশ্চর্য! আমিও প্রতিদিন পাখি হয়েই উড়ি নীল প্রজাপতি রঙ আকাশে অনুপম মাধুর্যে..
“শ্রী পলার ” বাড়ি যেতে যেতে পথ ভুলে যাই আমিও!
মাঝে মাঝে বেবুন বৃক্ষের ডালে একটু জিরিয়ে নেই
কিংবা পরিযায়ী পাখি হয়ে উড়ে যাই সাইবেরিয়া!
তোমার গোটা গোটা হাতের লিখা নীল প্রজাপতি রঙের ডায়েরিটা এখনো অনেক যত্ন করেই রেখেছি।

০৩
তোমার সঙ্গে আমার দেখা না হোক

তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে না আর
সেই ভালো! অনেক কাছাকাছি তবুও দুরে
অজস্র গল্প বলা রাত! জমে জমে আবারও রাত হবে
আবারও দিন হবে, মেঘ জমে বৃষ্টি হবে।

তোমার এলোমেলো কবিতার বই ইচ্ছে করে হলেও কিংবা অনিচ্ছায় ফেলে গেছো! আর তুমি ইচ্ছে করেই ফেলে গেছো তোমার শঙ্খ ঘোষ,সমরেশ মজুমদার,জয় গোস্বামী, নির্মলেন্দু গুণ, মাসুদ পথিকের ‘বনলতা ‘আর অলস দুপুর! তোমাকে ধরে রাখি যাতে।

তুমি হয়েছো মুক্ত। আমাকে করেছো মুক্ত!
জেনো! “এমন দূর্যোগের কালে আকাশও ডুবে যায় চোখে….. জমিন হারিয়ে যায় শষ্যকে ভালোবাসার অসুখে।
মানুষ চলে যায় শূন্যতা রেখে আর প্রিয় কিছু আঘাত।”

জেনো এভাবেই আমাদের রামধনু নির্জলা দিন
বয়ে যায়… গড়িয়ে যায়…হরিতকি সবুজ বনে
আমাদের নিঃশব্দে থাকার জাগতিক কর্মব্যস্ততায়!
অথচ একদিন বসন্ত দিন আমাদেরও ছিলো
চিবুক ছুঁয়েছিলো তুষার কনা সৌন্দর্য।
আমাদের হাত থেকে সরে যায় সেই পঙক্তি মালা সময়
তোমার পদচিহ্ন রেখে যাওয়া দীর্ঘতর মানচিত্রের
হারানো রাত্রির কল্পিত গল্পে।
হাজার মানুষের ভীড় ঠেলে হেঁটে হেঁটে যায়…
আমাদের অসমাপ্ত নিঃসঙ্গ ভালোবাসা অভিজিৎ সময়ে।

০৪
কবিতায় বাড়ি

কবিতা জুড়ে চমৎকার একটা নীল আকাশ দেখি
ছোট্ট একটা মায়াবতী নদীও বয়ে চলে
একটা ডিঙি নৌকাও থাকে
নদীর পাড়ে ছোট্ট একটা দোতলা বাড়িও থাকে
একটা চমৎকার নিভৃত বাগানও থাকে
অনবরত ডেকে যায় কতশত পাখি!
হেমন্তের মাঠে উড়ে ভরত পাখি মায়াবী বিকেলে
শিশির ঝরে পড়ে নিটোল রোদে
গুটিয়ে যায় বিকেলের আলো!
চার্চের ঘন্টা বাজে, দিপাবলী উৎসবের আলো ছাড়িয়ে।

নদীর জল হয়ে উঠে খানিক রহস্যময়
দোতলার ব্যালকনিটা ভীষণ প্রিয় হয়ে যায়
ল্যান্ড ফোনে রিং আসে ক্রমাগত!
মাঝে মাঝে দোতলার কার্ণিশে ঝিমোয় ছোট্ট মুনিয়া
কী আশ্চর্য বাস্তবে কোন দোতলা বাড়িই নেই নিজস্ব।
অনেকেরই নিজস্ব কোন বাড়ি থাকে না
যাদের নিজস্ব কোন বাড়ি থাকে না, ভূমি নেই
তারাও ছুঁতে পারে ঝাওবনী সবুজ, হেমন্তের ঘ্রাণ
পৃষ্ঠা পৃষ্ঠা কবিতা তাদের স্পর্শ করে না হয়তোবা!
অনেক কবিদেরও নিজস্ব কোন বাড়ি থাকে না
আমারও নিজস্ব কোন দোতলা বাড়ি নেই
কবিতার দোতলার ঝুল বারান্দায় বসে আমি
মাধবী রঙ আকাশ দেখি,একটা ছোট্ট ভরত লিখে
উড়ে যায় নিমিষেই!

০৫
বেলি ফুলের গন্ধের মতোন থাকি

আমার ভীষণ ইচ্ছে করে প্রিয়—–
মধ্য রাতে তোমার ঘুম ভেঙে যাক আকস্মিক
তুমি তখন উঠে বাইরে জ্যোস্নার আলপথ ধরে হাঁটো
কিছুক্ষণ পরে জ্যোৎস্নার শিশির শরীরে মেখে
আমাকে দেখার প্রবল ইচ্ছে জাগুক তোমার
আমার কথা মনে হোক প্রবল!

হঠাৎ কবিতা লিখতে ইচ্ছে করুক ঘুম ভেঙে যাওয়া মধ্য রাতে …. .
জ্যোস্না, সমুদ্র, পাহাড়, ঝিঁঝি ডাকা রাত,দ্রাক্ষা ফলের রসের মতো বৃষ্টির ফোঁটা,জ্যোস্নার ফোঁটার সঙ্গে
আমিও থাকি,তোমার কবিতায়…
একটা ছোট্ট ঘাসফুল হয়েই না হয় থাকি প্রিয় কবি!

তোমার মনে হোক, আমিও তোমার পাশেই ছিলাম রাতভর….
আমার শরীরের ঘ্রাণ চাঁপা ফুলের ঘ্রাণের মতোই মনে হোক প্রিয় তোমার কাছে!
আমাকে তুমি সারাটি রাত আগলে রেখেছিলে বুকের ভিতর, মনে হোক!
আমি ঘুমিয়ে মিশে ছিলাম তোমার অস্তিত্বে
আর তুমি কবিতা লিখে পড়েছো আমার পাশেই।

তারপর খানিকক্ষণ পর পাশ ফিরে দেখো
আমি নেই অথচ আমার খোঁপার বেলি ফুলের গন্ধ ছড়াচ্ছে ঘরময় কী আশ্চর্য তাইনা!
কস্টে তোমার বুক ভিজে যাচ্ছে প্রিয়..
অথচ আমি নেই ঠিকঠাক মনে হবে তোমার
ভালোবাসাতো ছিল,আমি আমি শরীরের গন্ধ তো ছিল
ঠিক চাঁপা ফুলের ঘ্রাণের মতোই কিংবা বেলি ফুলের গন্ধের মতোন ছিলাম তো প্রিয়।
অথচ নীরার মতো আমিও ভালো নেই প্রিয়।