রফিক উল ইসলাম এর কবিতা

87

কী যায় আসে
………………..
যেভাবে মধ্যরাত্রি আমাকে ভেঙেচুরে তোমাদের দরোজার মাপে
প্রস্তুত করে দেয়, তাতে আমাকে পিগমি বলাও যায়,
শূকরও বলতে পারো। বলায় কী যায় আসে?
আমাকে যদি নূপুর বলা হত, তাতেও কি
কম আনন্দ হত!

ওগো দূরন্ত চরণযুগল, তোমাদের কথা ভেবে নিয়ত এই
ক্ষুদ্র হতে থাকা। আমাকে যদি বালুকণা ডাকা হত,
দূরের কোনো সমুদ্রপারে জেলেনির বুকে জাগতুম।
এমন কী-ই বা হত? এই যেভাবে মধ্যরাত্রি
আমাকে ভেঙেচুরে তোমাদের তৃষ্ণার মাপে
তরল করে দেয়, তাতে আমাকে গিরগিটি বলা যায়,
শেফালিকাও বলতে পারো। বলায় কী যায় আসে?

আমাকে যদি আশাবাড়ি ডাকা হত, আমাকে যদি
শূন্য…

🍁
অমিত্রাক্ষর
……………..
গড়ানো জীবন অঞ্জলি ভরে তুলি, ফোঁটা ফোঁটা
ঝরে যায় তোর মুখ। একটি মুখের ভিতর
কত সহস্র নদী
পাহাড় এবং তিতির গ্রথিত হয়ে থাকে! নিরূপণ
বৃথা যায়। যাদের যে-নামে চিনেছি,
সায়ংকালে অন্যরকম, যে যার নিজস্ব নিয়মে
আপন দেশে ফেরে।

সবাই এখন উৎসবে গেছে। বনের ধারে কাঠ কাটছি
একা। একটি যদি পত্র খুঁজে পাই, গোধূলি আলোয়
পড়ে ফেলব। সন্ধে হলে কাঠের আগুনে সেঁকব শরীর,
যতক্ষণ না সবাই ফেরে। গড়ানো জীবন থেকে
ফোঁটা ফোঁটা ঝরে গেছে যারা, এই বনপথ তাদের জন্যে
বুক চিরেছে। বাতাস গেছে শান্ত হয়ে।
যে-নামে ফিরুক, যে অরূপে, একটি যদি পত্র খুঁজে পাই
অমিত্রাক্ষর, পড়ে ফেলব।

🍁
চতুর্থ পাথর
……………..
শেষ পর্যন্ত অন্তত চারটি পাথর হাতে থাকবে
আমার। তিনটির ব্যবহার আগেই জানা আছে,
অন্যটি নিয়ে কী করব ভাবতে ভাবতে দিন কেটে যায়!

একসঙ্গে এত দিকে পাথর ছুঁড়তে হবে, কল্পনা করিনি
কখনো। তাহলে তো অনেক জমাতে পারতুম।
বিদ্যার বদলে পাথর, নারীর বদলে পাথর,
স্বর্ণমুদ্রার বদলে পাথর,
অজস্র জমিয়ে ফেলতুম। এখন এই পরিণত কালে
চতুর্থ পাথরটিকে নিয়ে কী প্রাণান্ত লড়াই,
তেমন কোনো যাদুমন্ত্র হাতে থাকলে এই একটিই ভেঙে
দশদিকে ছুঁড়তে পারতুম।

পাথর ছোঁড়াই ধর্ম আমাদের। নির্দেশ আছে, অন্তত তিনটি
পাথর ছোঁড়ার কথা, তাও একদিকে। সে তো
সামান্য কাজ। এখন এই আধোঘুম কিংবা জাগরণে
চরাচর জুড়ে ভেসে উঠছে অজস্র ভূতুড়ে চোখ আর
আগুন। চতুর্থ পাথরটিকে আমি কোন দিকে ছুঁড়ব?

🍁

আমার ঈশ্বর
………………..
ভালো মানুষদের সঙ্গে সবসময় কীরকম এক অজানা ঈশ্বরের
গন্ধ লেগে থাকে। ঈশ্বর ঠিক কত প্রকারের হন?
গেরুয়া পাঞ্জাবির জন্যে একজন, কালো প্যান্টের জন্যে
অন্য জন? এভাবে পরিমাপ করতে গেলে কোটি কোটি ঈশ্বরের সঙ্গে
আমাদের নিত্য বসবাস। যাতে কোনো ছোপ না লাগে,
কালো যেন কিছুতেই ফ্যাকাসে না হয়।

ভালো মানুষদের ছায়ায় ছায়ায় যে ঈশ্বর সুরভিত হয়ে ওঠেন,
তাঁর হাতে গীতাও থাকে না, কোরআন এমনকী বাইবেলও
থাকে না। পথ থেকে পথের ভেতর হারিয়ে যাওয়া যে জীবন,
যেসব জটিল অনুপ্রবেশ, কোথা থেকে অল্প একটুখানি ভালো এসে
হঠাৎই সব সহজ করে দেয়। আমি শুধু সেই ঈশ্বরটুকুর খোঁজে
উদগ্রীব হয়ে থাকি।

সমগ্র একজন ঈশ্বরের যোগ্য আমি নই। সেই অভীপ্সাও
নেই আমার। শুধু একজন অতিসামান্য সহজ মানুষকে
যে ঈশ্বর সুরভিত করে তোলেন, আমি কেবল তাঁরই
স্পর্শ পেতে চাই!

🍁

ওহে, তোমরা
……….. ……..
কারবালার প্রান্তর থেকে যে বাতাস
ছুটে আসে লোকালয়ের দিকে, তার অন্তরে
পিপাসার আত্মা লেগে থাকে। সেই পিপাসায়
আমি তো সামান্য বারি, আমাকে খুন করতে পারো
এমন ছুরি তোমাদের হাতে নেই। আমাকে
শুষে নিতে পারো
এমন আলিঙ্গনও নেই তোমাদের!

ওহে, তোমরা, পুরো আকাশ তোমাদের চোখে
বসিয়ে নেওয়ার আগে, আমার জন্যেও
দু-এক ফালি রেখো। কারবালার প্রান্তর থেকে
ছুটে আসা বাতাস
যেন সেই আকাশে বৃষ্টি ঝরাতে পারে।

আমাদের সব সকালবেলার গান
আমাদের সব বিকেলবেলার পথ
পিপাসায়, পিপাসায়….

🍁