আবু তাহের সরফরাজের পাঁচটি কবিতা

55

দুই পথিক

দুই পথিক চলেছেন রাস্তা দিয়ে, খা খা দুপুর
ঝলমলে রোদ আর ছায়ার মধ্যে দিয়ে চলে গেছে রাস্তা, যেন
তারা হাঁটছেন আর তাদের পায়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে রাস্তা
আর দুই পথিক হারিয়ে ফেলছেন পেছনের পথ

যেন তারা পর্যটক
তাদের ঝুলি ভরে ওঠে জগতের টুকিটাকি দিয়ে
যেতে যেতে তারা ক্লান্ত হয়, বসে
গোধূলি-নদীর তীরে

তারপর তাদের ঘুম পায়, তবে তারা উঠে পড়ে নদী পেরোবে বলে
দুই পথিক সাঁতরে নদী পেরোতে থাকে
তবে একজন ডুবতে থাকে
তার ঝুলিতে জগতের এত ভার যে, সে ডুবতে থাকে
আরেক পথিক দিব্যি সাঁতরে যেতে থাকে, কেননা

পৃথিবীর কিছুই সে জমা করেনি, তার
অস্তিত্বের অনুভূতি ছাড়া।

চলো, মানুষের মতো খেলাধুলা করি

পাথর ভেঙে গড়িয়ে দিচ্ছ
ওপর থেকে নিচে গড়িয়ে পড়ছে পাথর
তুমিই আবার নিচের থেকে গড়িয়ে দিচ্ছ
নিচের থেকে গড়িয়ে পড়ছে পাথর

তুলে নিচ্ছি আমি। তুমি হাসছ আর গড়িয়ে দিচ্ছ পাথর…
এই খেলা জনে জনে রটে গেল ভবে
ফলে মানুষ শিখে গেল আমাদের কৃৎকৌশল
তারা এখন পাথর গড়িয়ে দিচ্ছে
তারা এখন পাথর কুড়িয়ে নিচ্ছে
তারা শুধু জানলো না হাসির রহস্য, চলো

আমরা এবার পাথরভাঙার কাজ করি
দু’চারটে পাহাড় ভাঙি, এরপর
সিসিফাসের সাথে এসো লেগে যাই অর্থহীন কাজে
এদিকের পাথর ঠেলতে ঠেলতে ওদিকে নেই
ওদিকের পাথর ঠেলতে ঠেলতে এদিকে নেই

এই খেলাও বেশ প্রাচীন
হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ খেলে আসছে
ব্যক্তিজীবন খেলছে সমাজজীবনে
সমাজজীবন খেলছে রাষ্ট্রীয় জীবনে

চলো, মানুষের মতো তাই আমরাও খেলাধুলা করি।

মানুষ আসলে কে কাকে বোঝে

শোন, শোন ছায়াবীথি, কী এক পাখি ডাকছে। কী যেন বলছে, নারে?
মাথা নেড়ে ছায়াবীথি বলল, আমি যে বুঝি না বাবা। কী বলে ওরা?
থমকে যাই। ভাবি। সত্যিই তো, ছায়াবীথি বলবে কী করে তা
আর আমিও কী তা জানি?
ভাবলাম। এরপর ওকে বললাম, এই যে পৃথিবী
একটি সংসার
যেরকম আমি তুমি আর তোমার আম্মু একটা সংসার
এই রকম, পৃথিবীর সংসারে কত কত প্রাণী
এই যে পাখি এই যে কুকুর এই যে বেড়াল
একই সংসারে থেকে এক প্রাণী আরেক প্রাণীর ভাষা বুঝতে পারে না
পাখির ভাষা তুমি বোঝো না, আমিও বুঝি না
কুকুর ডেকে ওঠে, সেই ডাক, তাও বুঝি না
মিঁউ মিঁউ বেড়াল ডেকে ওঠে
কী বলতে চায়, বুঝি না
পৃথিবীর সব মানুষের ভাষাই যে মানুষ বুঝতে পারে, তাও না

কত কত ভাষা
কত কত ভাষা আবার বিলুপ্ত হয়ে গেছে
এক ভাষার মানুষ আরেক ভাষার মানুষের কথা বুঝতে পারে না
যেরকম মানুষ বুঝতে পারে না বেড়ালের ডাক

ছায়াবীথি চেয়ে রইল আমার মুখের দিকে। বুঝতে পারলাম, আমি যা বলছি
আমার ছোট্ট মেয়ে তা বুঝতে পারছে না
আমার ভাষা ছায়াবীথি বোঝে না

মানুষ আসলে কে কাকে বোঝে?

তৃষ্ণার গন্তব্য

বুকের ভেতর খুন হয়ে তুই রক্ত ছলাৎ ঢেউ
ঢেউয়ের মানে এই জগতে জানলো না আর কেউ।
কেউ না জানুক, আল্লাহ জানেন, তৃষ্ণা তারই পথে
তসবিহ দানা খুঁজতে গিয়ে ঠেকল কী এক হাতে!

হাতের ওপর হাতের ছোঁয়া পরম মমতায়
একজীবনে এইটুকু প্রেম সুন্দরে প্রাণ পায়।
প্রাণ খুলে যায় জগৎ মাঝে, দেখি পরম রূপ
রূপ সদাগর একটু হেসে পরক্ষণেই চুপ।

ডাক দিয়েছি নাম ধরে তোর রক্ত তুলে মুখে
তৃষ্ণাকাতর শহিদ আমি কারবালা সম্মুখে।
তুই এলি না, আসলো যেজন তারই পদধ্বনি
মৃত্যুসম যন্ত্রণাতেও কান পেতে আজ শুনি।

শরীর ছেড়ে প্রাণ উড়ে যায়, হঠাৎই সুন্দর
দিলেন খুলে মহার্ঘ্য তার রূপেরই অন্দর।
সুন্দরে যে লীন হতে চায়, সুন্দরও চায় তাকে
এই সত্য লেখা আছে তৃষ্ণানদীর বাঁকে।

মানুষ বেঁচে থাকে

গোলগাল চাঁদ সাঁকোটা দুলছে তিরতির কাঁপে দেহ
দুই পারে দুই মানুষের ছায়া, দুলতেছে সন্দেহ।
ভেঙে যায় ছায়া দেহ খুলে তাই বেরিয়ে এসো হে প্রাণ
ধরো, চিৎকারে আর চিৎ করে নিতেছো চাঁদের ঘ্রাণ।

চাঁদের গর্ভে ফুটে থাকা ফুলবাগানের কাছাকাছি
আমাদের দেহ আর হৃদয়ের উত্তাপে বেঁচে আছি।
বেঁচে তো রয়েছি শ্বাস নেব বলে শাসিত দেহের বাইরে
গর্ভকেশর ছড়াতেছে রেণু প্রাণের ওপর তাইরে।

বেঁচে থাকা মানে স্মৃতি-বিস্মৃতি এক জীবনের ঘোর
পেরিয়ে এসেছি মৃত্যুর মতো দেহ গহ্বর তোর।
দেহের ভেতরে রাজহাঁস ডাকে উটের মতো গ্রীবা
বাড়িয়ে সে ডাকে, গোধূলির নদী পেরিয়ে এসো হে রিপা।

মুগ্ধতা নয়, আরও প্রগাঢ় প্রেমিকের অনুভূতি
ভেঙে পড়ে চাঁদ, থত্থর কাঁপে সাঁকোটার বাঁশখুঁটি।
দুই তীরে দুই দেহ নিয়ে কেন দাঁড়িয়েই আছি আমরা?
আমাদের খুব ভেতরে কাঁপুনি টানটান তবু চামড়া।

গোলগাল চাঁদ সাঁকোটা দুলছে, পেরোবে কীনা তা বলো
দুই হৃদয়ের মাঝে শূন্যতা ভরাট করি হে চলো।
কী কী সব যেন মায়া রহিয়াছে এই ভবদহে হায়
আমি তো আউট সাইডার হয়ে সাইডেই থেকে যাই।

অথচ আপাত দৃশ্যে মানুষ বেঁচে তো থাকেই ভবে
দেহ আর ছায়া একাকার হোক, কবে যেন তা হবে?