সাবিনা ইয়াসমিন এর গুচ্ছ কবিতা

76

দাবীর সংলাপ- তার প্রতি

ছায়াময় সুদূরের
তোমাকে আমি
কি বলি
কেমন করে বলি
ছেড়েছি দানাপানি
পুড়িয়েছি মন
সাগরের জলের লবন
ধরেছি চোখে
জমিয়ে রেখেছি
থোকা থোকা
বিহ্বল মেঘ
মুক্তকেশে।

ছায়াময় সুদূর
কি করে তোমাকে বলি
মোড়কে বন্দী করে রেখেছি
তোমার তৃষ্ণায়
আমার কাতর-স্বর
বয়ে নিয়ে চলেছি মরণ
যে অশ্ব চলে গেছে
তার খুরের ছাপ ফেলা
ধুলোর মাঠ-
ফিরে এসো
ভালোবেসে
এইসব
দাবীর সংলাপ।

যখন সন্ধ্যা নামে

যখন সন্ধ্যা নামে
দিঘিজলে কেঁপে ওঠে
মরালের ঝাঁক
তাদের ক্রেঙ্কার
ভাসিয়ে নিয়ে আসে হাওয়া

তখন আমাদের
বুকের ভেতরও
এক অদ্ভুত ক্রন্দন-ক্রেঙ্কার
বেজে ওঠে

আমরা জানতে পারি না সে কথা
জানতে পারি না সে সুর
জানতে পারি না সে ক্রন্দন।

যখন সন্ধ্যা নামে
তখন সপ্রাণ তারাদের সাথে সাথে
জ্বলে ওঠে শৈশব
জ্বলে ওঠে
চাঁদ-ঘুড়ি, মার্বেল
লাঠি-লজেন্স, পাঁচ-গুটি
ফুল-টোক্কার ছোঁয়া।

আমরা জানতে পারি না সে কথা
জানতে পারি না সে খেলা
জানতে পারি না সে স্পর্শ।

যখন সন্ধ্যা নামে
তখন দিঘিজলে ডুবে থাকা
কালো পাথরের চাঁই
আমাদেরও বুকে এসে বসে।

আমরা শুধু সে পাথর
বয়ে নিয়ে চলি অজান্তে
অজানায়।

একার সন্ন্যাস

কোন কিছুই চিরকাল একরকম থাকে না
বদলায়, বদলাতে থাকে
প্রেমিক, কবি, নক্সাল বিপ্লবী
জনসংখ্যা, জনসংখ্যা তত্ত্ব
শোক, সংহতি
ভরাভরতি নদী, স্থাণুর মতো
দাঁড়িয়ে থাকা চাঁদের আকার।

তুমি চলে যাবার পর
আমিও বদলে গেছি খুব
মেঘ-মল্লার ভুলে গেছি
প্রাণ-ঝঙ্কারও।

আর খোপের পায়রাগুলোও
ওড়া ভুলে গেছে
ভুলে গেছে ওদের পায়েই
বাঁধা রয়েছে
বিরহকালের
মাণিক্য-মাধুরী-চিঠি।

মৃত্তিকা

প্রিয়বন্ধু
প্রীতি ও শুভেচ্ছা
তোমার চিঠি পেলাম।
অ্যারোনেটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ দিয়েছ
অভিনন্দন।

আমার সমাচার এই
খুলে ফেলতে পেরেছি মুখোশ
আর অনেক নামের সমাহার থেকে
ফিরে পেয়েছি ব্যক্তিগত ডাকনাম।

এখন আমি গর্বভরে
মৃত্তিকায় পা ফেলে হাঁটি।

গোলাপ, কাঁটা অথবা ঈশ্বরের গান

যদি পরলোক বলে কিছু থেকে থাকে
যদি অনন্তলোক বলে কিছু থেকে থাকে
তবে অন্ততঃ সেখানে এসো
গোলাপ বা কাঁটা
যা কিছু হোক
হাতে।

এমনই চাঁদের কিরণ-সুষমা
যদি সেই লোকেও থেকে থাকে
সাপাডিলার চিরল পল্লবে
যদি নেমে আসে ঈশ্বরের গান
যদি বিরহ সে গানে এমনই বিষাদে বাজে

তবে দেখ এক দলছুট মেঘ
ওড়ে এলোমেলো
ঘোরে পাগলের পারা
আকাশব্যেপে মেলে দিয়ে মৃত্যুময় ডানা

তবে অন্ততঃ মর্মরিত ঝাউবন হয়ে থেকো
যেনো ঘোর লেগে যায় সে মেঘের
আর
মেঘের পাঁজর ভেঙে
ঝাউ এর বুকে
অঝোরে নামে বৃষ্টি।

তীর্থ

হ্যালো, শোনো
তুমি ফোন করেছো
অমনি মুর্ছা গেছে নদী

ভেনিস লেকে লাজুক ডিঙার বহর
থমকে গেছে
থমকে গেছে রঙিন দম্পতি।

হ্যালো, শোনো
গোপন আবেশ,
তোমার নাম কাউকে বলিনি

ওয়াটার বাসের সান্তা বুড়ো
জানতে চেয়েছিল
বলে দিয়েছি ‘তাকেই তীর্থ মানি।’

বাবা

তুমি ছিলে না বলে
আমাদের কোন শৈলাবাস ছিল না
গিরিকন্যা কিন্তু ঘুমিয়েছি মেঘে-মেঘে।

আমাদের মেঘের আঙিনা ছিল উৎসববিহীন
না নবান্ন, না কোন পানচিনি, জলসই আমাদের ছিল।

আমাদের ছিল শুধু আষাঢ়ে-শ্রাবনে চরৈবেতি।

মৌরসিপাট্টায় পাওয়া
তোমার সান্ধ্যভ্রমনের সাথী
হাতির দাঁতের ছড়িটি ছিল আমাদের যাদুদণ্ড।

আমরা ওই যাদুদণ্ড দিয়ে
ক্ষুধার রাতগুলিতে
চাঁদ পেড়ে খেয়েছি কতবার।

কতবার ওই যাদুদণ্ডে বুক পেতে দিয়ে
ইকারুসের ডানার মতো
সূর্যে মেলেছি দীঘল পাখা
নীরবে সয়েছি রৌরবদাহন।

কতবার আমাদের পাশ দিয়ে উড়ে গেছে
স্কন্ধকাটা ভূত আর রাক্ষসের দল
আমরা মেঘে মেঘে লুকিয়ে ফেলেছি
মানুষ মানুষ ঘ্রাণ।

কতবার আমাদের দেখতে হয়েছে বজ্রপাত
কত ঝড়-ঝঞ্ঝা
দু’হাতের আড়ালে মুখ রেখে সয়েছি।

কতবার আমাদের খুন করা হয়েছে
আর আমরা আমাদের খন্ডিত হৃৎপিণ্ডকে হাতে তুলে বলেছি, ‘সহো’।

রোদ্দুর ভাগাভাগি করে
তাড়িয়েছি শীত
আর আগের চেয়েও উজ্জ্বল হয়ে বেঁচে উঠেছি
ওই যাদুদণ্ডের হীরকস্পর্শে।

তোমার ওই যাদুদণ্ডটি
আমাদের নূহের ছড়ি
আমরা উত্তাল সমুদ্র কেটে কেটে
তৈরি করে নিয়েছি
এগিয়ে যাবার পথ।

সন্ধ্যাকাশের উজ্জ্বলতম তারা হে,
কতবার তোমাকে কেঁদে কেঁদে ডেকেছি, ‘বাবা’।