ফিরোজ আহমেদের গুচ্ছ কবিতা

67

যাব না কোথাও

একদিন বহুদিন আগে
তুলসীতলার কাছে
পিদিম হাতে দাঁড়িয়ে
গোঁয়ারের মত নীলিমা বলেছিল-
“কোথাও যাব না আমি”।

নীলিমাকে যেতে হয়নি কোথাও
কাছেই ক্যাম্প ছিলো একটা
চিবানো শেষ হলে
নীলিমাকে ফেলে দেয়া হয়েছিল
খালের পানিতে।

নীলিমার যাওয়া হয়নি কোথাও
নীলিমাদের যাওয়া হয়নি কোথাও
ক্যাম্পের অদূরে খালের পানিতে
ডোবায়, নালায় কিংবা
বড় করে খোঁড়া গণসমাধিতে,
যশোর রোডের দুপাশের জমিতে…
এর বাইরে নীলিমারা যায়নি কোথাও।

একদিন বহুদিন আগে
নীলিমা বলেছিল
যাব না কোথাও।

কথা রেখেছিল নীলিমা,
যায়নি কোথাও…


সন্ধ্যারাগ

এখনও আমার উঠোনে তারা খসে
রাত হলেই মুখর হয় অযুত জোনাকী
জ্যোৎস্নায় হাজির হয় স্বপ্নের শব
ঝিঁঝিঁর ডাকে নিভে যায় শহর, কলরব…

এখনও তোমাকে ভাবলেই চোখে জল আসে
হৃদয় মোম হয়ে গলে পড়ে, হায় পাথুরে হৃদয়!
তোমাকে ছাড়া বেঁচে আছি ঢের,
তুমি নেই তবু কেটে গেছে একশ বছর…

তুমি নেই, নেই তুমি, যেন আজব হাহাকার
ডুবে ডুবে কাঁদে পানকৌড়ি মন
দিগন্ত মিশে যায় অতল আহ্বানে
তুমি নেই যেন ছিলে না কোনোদিন, কোথাও…


প্রত্যাগত

একটা ফুর্তিবাজ হাওয়া ঘরে ঢুকে পড়েছে,
টেবিলের আলগা কাগজ,
রান্নাঘরের পেঁয়াজের খোসা
উড়িয়ে বেড়াচ্ছে ঘরময়,
যেন বলছে-
তুমি আসবে, তুমি আসবে…

বহুকাল তুমি আস নাই-
বাগান শুকিয়ে গেল,
বাগানের গাছের কাঠবেড়ালিটাও নিরুদ্দেশ,
উধাও ফুল, কলের জল, বারান্দায় জমিয়ে রাখা সুখ,
রাতের পরিচ্ছন্ন ঘুম, সেতারের টুং টাং
সব, সব হারিয়ে গেছে বহু আগে…

আজ হঠাৎ এক ফুর্তিবাজ হাওয়া
ঘরে ঢুকে বলছে
তুমি আসবে,
রাতজাগা লাল চোখে তাই
দিকচক্রবাল দেখছি-
তুমি আসবে, তুমি আসবে…


সুখটান

হঠাৎ কেউ অবেলাতে বাসলে ভালো,
ডাকলে কাছে নিবিড় করে,
কার কী ক্ষতি?
সূর্য ডোবার একটু আগে
পথের বাঁকে, চমক দিয়ে
যদি ফেরে তাহার মতি,
দুজন যদি বসি পাশে কাছাকাছি
কিংবা সামনে মুখোমুখি
থামবে গতি?
যা হয়নি যৌবনেতে পার্কে যেয়ে
হয়নি দেখা সিনেমাতে
হয়নি হৃদয় চপলমতি,
পুরোনো সেই মুগ্ধচোখে, থাকি চেয়ে
গালের আবির নেইকো বলে
যায় আসে কী?
আবার যদি অঝোর ঝরে, অশ্রু ঝরে
চোখের জলে ভেজে যদি তপ্ত মাটি
কার তাতে কী?

শুন্য জীবন পূর্ণ হলে
কার কী ক্ষতি?


অশরীরী

হরিপদ, তোমার বেদখল হওয়া আকাশ থেকে
আজও সন্ধ্যা হলেই তারা খসে,
আজও পূর্ণিমায় দিগন্ত ভেসে যায়
প্রগলভ হাহাকারে,
তেমন ফুল দেখলেই মৌমাছি নাচে,
পাত্রে জমে তুতেনখামেনের মধু-
অথচ তুমি সব ছেড়েছো হরিপদ…

হরিপদ তোমার ফেলে যাওয়া লাল নিশান
আজ সেলাই ঘরে টুকরো হয়ে গেছে,
বের হচ্ছে রপ্তানিপণ্য, পোশাক,
ক্রিসমাস এলেই লাজরাঙা নারী
স্কারলেট রঙা খাটো স্কার্টে সাজে,
নারী সে তো নদীর মতই-
তোমার একটা নদীও ছিল হরিপদ…

হরিপদ তুমি আকাশ, নদী, নিশান সব ছেড়ে
কোন পিরামিডতলে সমাধি নিলে?
কোন আতরের আড়কে ডুবেছে
তোমার মন আর শরীর?
আহ শরীর! তোমার শরীর আজ
কোথায় জেগে রয় হরিপদ?
নাকি আদৌ জাগেনি শরীর কোনো পূর্ণচাঁদে?
নাকি তুমি এক অশরীরী আপদ?
হরিপদ, ও হরিপদ…