আসাদ মান্নানের গুচ্ছ কবিতা

66

০১
ঘুমাও সমুদ্র শিশু, ঘুমাও

আঁতুড়ঘরের আলো আর সমুদ্রের অন্ধকার চুক্তি করে মিলননামায়। অতঃপর সেই নবজাতকের জন্ম হলো,যার আগমনে প্রথা মতে দেয়া হলো সুরেলা আজান, কৃষ্ণের মন্দির থেকে শোনা গেলো দীর্ঘ উলুধ্বনি।

আনন্দের জাগরণে বাতাসে হেলান দিয়ে জেগে ওঠে সমুদ্রের তরল জরায়ু ; রূপসী নার্সের মতো নক্ষত্রের শাদা দাঁত বের করে হাসতে থাকে নিদ্রাহীন রাত ; রাশি রাশি ফুলের হলুদ গন্ধে সর্ষে ক্ষেত ভরে যায় বৃষ্টির ফোঁটায়; ঝাঁক বেঁধে গাঙচিল উড়ে আসে শ্যামল উঠোনে; অন্ধকারে দুঃখিনী মায়ের ওষ্ঠ্যে উঁকি মারে পূর্ণিমার চাঁদ।

মহাশূন্য থেকে পা ও হাত ছুড়তে ছুড়তে একদিন মায়ামাখা ওই স্বর্ণদ্বীপে নেমে আসে এক নগ্ন শিশু : আলোর ঝর্ণায় তার প্রথম গোসল; বাতাসের জ্যোৎস্না আর রঙ দিয়ে অন্ধকার কেটে কেটে তার জন্য তৈরি হলো ঘুমের মহল।

নরম কয়লার ঘুমে নিমগ্ন শিশুর চোখে চুমু দিয়ে যিশু তাকে বললেন, হে শিশু তোমাকে স্বাগতম; সমুদ্রের গান কিংবা জলের ক্রন্দন বুকে তুমি ছাড়া অন্য কেউ এইভাবে ঘুমোতে পারে না; ঘুমাও সমুদ্র শিশু, ঘুমাও …সূর্য আর জলের মহিমা নিয়ে বেঁচে থাকো কালের আঁচলে– বারুদের গন্ধ থেকে মুক্ত করো মানববাগান।

০২
কবিতার শাড়ি

আসলে কুয়াশা হলো কবিতার প্রাণ
এ-ই বুঝি সরে গেল আলোর ছোঁয়ায়
আবার শব্দের সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায় —
অসীমের হাত ধরে শূন্যের উদ্যান।

পাতাকে সরিয়ে দেখো ফুলের আসন
কী করে অহং রঙে ছড়ায় সৌরভ!
ভোর আসে ভোর যায় ঃ সময়ের ধন
নিজের স্বভাবে নিত্য বিলায় গৌরব।

কবিতাকে বুঝতে মেয়ে হাঁটে অভিধানে
হাঁটতে হাঁটতে দেখে শুধু লাশ আর লাশ
অর্থের অঙ্গনে গিয়ে কবিতার প্রাণে
জাগাতে পারে না ঢেউ উলঙ্গী বাতাস।

কবিতা রমণী এক ঘোমটা পরা নারী,
অন্তহীন কুয়াশায় তৈরি যার শাড়ি।

০৩
না-লেখা কবিতা

এবং আমার আছে অগণিত অগ্রজ অনুজ;
এবং আমার আছে কবিতার গহন দরিয়া
দরিয়াকে মুখে নিয়ে খেলা করে জলের সম্রাট
দিন ও রাত্রির সহবাসে জন্ম নিচ্ছে নীল পদ্মদিঘি
ওখানে সাঁতার কাটে রক্তে ভেজা তাজা অন্ধকার —
এবং আমার আছে
আলোর সারথি
আছে
অনেক শুভানুধ্যায়ী
পাঠক ও বন্ধু;
আমি ঋণী
সকলের কাছে
সকলের প্রতি
আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ভালোবাসা অশেষ শুভেচ্ছা ; কিন্তু
জানা নেই ভাষা
ভাষা নেই জানা
কী করে জানাতে হয় কৃতজ্ঞতা!
কী করে ডিঙ্গাতে হয় চক্রবৃদ্ধি ঋণের পরিখা
তা আমার জানা নেই–
জানা নেই
ভালোবাসা কোনপথে একপায়ে হেঁটে যায়!

অবাক হয়েছি আমি– এতো এতো প্রিয়জন
কাছে দূরে — দেশে ও বিদেশে
একজন ছাড়া
সবাই আমার মতো অতি তুচ্ছ এই ক্ষুদ্র
নফর কবিকে
এত ভালোবাসে!!
ফুলগুলো ঝরে যাবে, উবে যাবে গন্ধ হৃদয়ের
জীবন ফুরিয়ে যাবে খরচের হিসাব খাতায়
দেখতে দেখতে উদ্ভিদের পাতা থেকে ছায়া সরে যাবে
সরে যাবে ছায়া;
তবুও তোমার জন্য রেখে যাব
পাঁচ লক্ষ না-লেখা কবিতা।

০৪
আমি যখন এ কবিতাটি লিখছি

কুয়াশাকে কাঁধে নিয়ে সামনে যায় মানুষ এগিয়ে;
উড়ন্ত ঘোড়ায় চড়ে পাড়ি দেয় জলের পাহাড়
নক্ষত্রের জামা গায়ে জয় করে নীলিমার নদী–
শরীরের শেষ রক্তবিন্দু ফুরিয়ে যাবার আগে
সন্তানের মুখে দেখে অমরত্ব—উত্তরাধিকার;
আশা ও স্বপ্নের নামে চায় মৃত্যুকে হটিয়ে দিতে;
তবু থাকে মৃত্যু ভয়– হাতে ধরে অলৌকিক লাঠি:
সাজানো গোছানো ঘর সংসার তছনছ করতে করতে
জনারণ্য ভেদ করে অদৃশ্য তীরের ফলা; হায়!
ধনী বা নির্ধন ছোট বড় নির্বিশেষে যাকে পাচ্ছে
তাকে ধরছে– বিদ্ধ করছে — নিখুঁত নিশানা :
ঠুস ঠাস শব্দ করে ফেটে যাচ্ছে প্রাণের বেলুন
স্বনির্মিত অন্ধকারে বন্দি পাখি হারিয়েছে ডানা।

০৫
যখন এ কবিতাটি আমি লিখছি তখন পৃথিবী
একটা স্তব্ধতা চোখে অসহায় ভিক্ষুকের মতো
হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে; তার চারপাশে
মশা-মাছি দুই সহোদর আনন্দে গাইছে গান
পুরনো মেথরপট্টি জেগে রয় নতুন উদ্যমে
রাতভর পথভোলা মাতালের অশ্লীল নেশায়
ছায়াকে জড়িয়ে গায়ে অন্ধকারে হাঁটে পথচারী
যৌবন বিপন্ন হয় রক্তহীন বরফের নিচে।
শরীরের দায় দেনা বেচা কেনা তবু থেমে নেই;
মধ্যরাতে ঘুম ভাঙে– নিশিকুঞ্জে নেশার আড়ৎ :
কিছু কিছু নেশা আছে কেটে গেলে নেশাই থাকে না;
কিছু নেশা আছে এমন উদগ্র আর দুর্বিনীত
কেটে গেলে ইচ্ছে হয় আবার নতুন স্বরে গাই
মহুয়া ফুলের গন্ধে জীবনের অজানা সঙ্গীত।

০৬
যখন এ কবিতাটি আমি লিখছি তখন বাইরে
কী অদ্ভূত প্রক্রিয়ায় চলছে এক অচেনা কার্ফিও,
যে কার্ফিও পৃথিবীর বাসিন্দারা কখনো দেখেনি–
এ উদ্ভট উল্টোরথে যে-মানুষ কখনো চড়েনি
সেও আজ চলতে থাকে অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে
এ রথ পেছন দিকে এইভাবে যেতে থাকে যদি
হয়তো-বা চাকা খুলে ঢুকে যাবে রাক্ষসপুরীতে;
আহা,মানুষের এই পেছনযাত্রা কে পারে থামাতে !

কোন পথ ধরে হাঁটে মানুষের বাঁচার ঠিকানা?
যে গ্রহে মানুষ নেই জীব-জন্তু কখনো ছিল না
সে গ্রহের নাম মুখে জ্বলবে নাকি সন্ধ্যার জোনাকি;
ক্ষেতের ফসল ফেলে মাঠ ছেড়ে তাকে যেতে হয়
কুয়াশা তাড়ানো ভোর আসবে কবে দিগন্তের পেটে–
নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বলে তাজা শিউলি ফুটবে কবে!

০৭
আমি এই কবিতাটি যখন লিখছি তখন দেখছি
শহর-বন্দর গাঁয়ে পথে ঘাটে বাজারে মাজারে
এমনকি গণিকার নিখদ্দর বেকার কুটিরে
গার্মেন্টস পল্লী হতে শুরু হয়ে শপিং সিঁড়িতে
অফিস পাড়ায় আর কেরানীর গোপন পকেটে
হোটেল মোটেল পার্ক শরণার্থী রোহিঙ্গা শিবিরে
সারি সারি মিলিটারি টহলে নেমেছে; দেখি
সৈনিকের হাতে কোনও মারণাস্ত্র নয়, ধরা আছে
বন্দুকের পরিবর্তে নিরাপদ স্যানিটাইজার,
মাস্ক মুখে হাঁটে খণ্ডখণ্ড ব্যক্তিগত নিরাপত্তা—
সামাজিক দূরত্ব বিধানে মানুষের আয়ু তাতে
যদি-বা নিশ্চিত করা যায়!একজন সৈনিকের
মাথার খোড়লে সারাক্ষণ পড়ে থাকে গুলিবিদ্ধ
স্বপ্ন নয়, লক্ষ কোটি মানুষের বিপন্ন হৃদয়।

০৮
মানুষ মারার জন্য মানুষেরা বহু আগে থেকে
দেশে দেশে গড়ে তুলছে সশস্ত্র বাহিনী, দক্ষ যোদ্ধা!
এসব যোদ্ধার হাতে দেশ ও মানুষ রক্ষা পায়
বিদেশী শত্রুর গুপ্ত কিংবা প্রকাশ্য হামলা থেকে;
সর্বদা প্রস্তুত থাকে সৈনিকেরা– যে-কোনো দুর্য়োগ
মোকাবিলা করে থাকে অসীম সাহসে, এমনকি
জীবন উৎসর্গে তারা কিছুতেই পেছনে হটে না–
‘মার কিংবা মরো’ –এই মন্ত্রে সব দেশে সৈনিকেরা
দীক্ষা নেয়—প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকে, অন্য কোনো রাস্তা
খোলা