শেখ মুসলিমা মুনের গুচ্ছ কবিতা

129

ধুপছায়া

আনন্দ,
তুই কি আমার ঝ’ড়ো হাওয়া
না-কি ফিনিক্স পাখি হবি?
যদিও আমি ভেবেইছিলাম,
হয়তো’বা তুই পাখিই ছিলি…
তাই না হলে যত্ন করে-
কুটো কুড়োই, রঙ-বেরঙের?
সকাল-বিকেল জড়ো করি?
ছোট্ট খাঁচা বুনবো বলে?
খাঁচাটাকে রাখবো পুরে,
বুক পকেটের নীলচে খামে?
ঝড়-বাদলে, বন্যা-খরায়,
রাখবো তবু নিরাপদে-!
যখন খুশি আসবি উড়ে,
বসবি পাশে খাঁচার মাঝে-
ইচ্ছে হলেই স্বাধীন হবি,
কান্না-হাসি, দুঃখ-সুখে!
গল্প করবি যখন-যেমন,
হেসে-খেলে, জোৎস্না-জলে!
মনের সুখে গান গাইবি-
ইচ্ছে হলেই মোহন বাঁশি
শুনবো তখন দিনে-রাতে!
মন-খারাপের দিবস হলে-
বিষন্নতায় মৌন ময়ূখ-
সুখের পায়রা উড়িয়ে দেব,
বাঁধ ভাঙা সেই ঢেউয়ের জলে!
অঝর ধারায় কাঁদতে চাইলে,
তা-ও পারবি, নীল-আনন্দে!

এখন তবে কথায় আসি-
তোকেই তবু, ঠিক করতে হবে-
ঝড় হবি, না ফিনিক্স পাখি ?

ধুপছায়া ০২

আনন্দ,
চল্ না যাই ভেসে, ভেসে-ভেসে, মেঘের ওপারে মেঘ, মেঘ হয়ে-যাই বহুদূরে…
যাবি?

সমুদ্র ছুঁয়ে ছুঁয়ে নীলাকাশ-পথ চিনে নিলয়-অলিন্দ ভরে আনন্দ ভ্রমনে যাবি …
যাবি?

উড়ে যেতে যেতে যদি’বা হারায় দম, কখনো ক্লান্ত লাগে-
পুনঃপুন দম নিতে হয়…
নিবি?

ডানা মেলে উড়বার শক্তি যদি’বা ফুরায়, আছে যে তোর ডানা, মেলে দিতে হয় যদি…
দিবি?

আমি যে শূন্যতা এক, আমার ওজন-ভরে মাধ্যাকর্ষনে তাই যদি না সূত্র মেলে…
হয় বিপরীত, তবে তুই সেই সূত্র কোথা হতে পাবি!
পাবি?

সূর্য কেবলই যদি করে ভর-সোনালী ডানার চিলে…
পথ-হারা মেঘ-জলে, ভালোবেসে খোঁজে পথ-
নিজেকে হারাবি…
হারাবি ??

ধুপছায়া ০৩

আনন্দ,
এমনতো নয়, এখনো
ঘোর বর্ষা, অমানিষা-অন্ধকারে?
অপেক্ষা হয়নি শেষ-
আসেনি বসন্ত ঠিক,
তবুও দেখেছ কী আজ-
মৃদু-মন্দ সুরেলা হিমেলে-
কুঁড়িরা ফুটেছে কেমন পূর্ণ-বিকাশে?

বুনো-গন্ধ, অরণ্য সবুজ-
তবুও মৌ মৌ-আহা-কী মিষ্টি সুবাস! হৃদয় আঙিনা ভাসে দখিনা বাতাসে?

দেখ কান পেতে-
ভোরের মৌনতা ভেঙে
দুঃখি দূর্বারা যেন-
শিহরিত শিশর-স্নানে!

দু’চোখ মেলে চেয়ে দেখ-
মাটির চোখে মাদকতা আজ,
নোনা জল শুষে নিয়ে-
ডুবেছে কী কাজল আবেশে…

আহা!

অনাঘ্রাতা ভূঁই বুঝি তাই সব ভুল ভুলে মুছে ফেলে পেতেছে আঁচল-সেই ঝরা বকুলে!!

প্রতীক্ষা

সন্ধ্যার আকাশ জুড়ে এক নিবিড় বিষন্নতা আমাকে প্রায়ই এলোমেলো করে দেয়।
আচ্ছন্ন করে রাখে চুপিচুপি নেমে আসা নিভৃত সন্ধ্যার প্রগাঢ় মৌনতা!
কুলে ফেরা পাখিদের বড় বেশী আপন মনে হয়!!

তবুও অহর্নিশ কেন প্রতীক্ষায় থাকি…

জানিনা সে কোন পাখি?

ভালবাসা নিঃশর্ত নয়

ভালবাসা-সেতো আমার জন্য নয়!
জেনে গেছি, জীবনে কিছুই নিঃশর্ত নয়…

কোন মৌন সাধকের ধ্যান ভাঙাই এমন রূপ-লাবন্য-সৌন্দর্য নিয়ে জন্মইতো হয়নি আমার!
গুণান্বিত নই-কোন কলা-বিদ্যায়!
হাসিতে ঝরেনি মুক্তো কোনদিন…
ঝরনার সাথে নাই জানাশোনা।
পত্র পুষ্পে পল্লবিত গোলাপ বাগানের মালিকানা কখনো আমার ছিল না !
সুর ও সংগীত অন্যের দখলে…
ইজেল- রং-তুলি সেও এক বৈশাখী ঝড়ে উড়ে গেছে বহুদিন আগে!

ফিরে পাবার তাড়নাও নেই কোন…

গোপনে কবিতা শোনাবে বলে
প্রস্তুতি নিয়েছে যে, সে অন্য কোন কবি…
তাই কবিতা তোমায় দিয়েছি ছুটি –
ধার করা স্বভাব-বিরুদ্ধ,
চুরি বিদ্যা শেখা হয়ে ওঠেনি কোনদিন!
শিখেছি যা জীবনের দামে তাও রেখেছি লুকিয়ে আঁচলের খুঁটে…

এমন কি ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনি-
সেও আমার নয়!
ঝরেছি নিরবে, শব্দহীন শুন্যতায়!

তাই ভালবাসা চাই, বল কোন অধিকারে?
সে কখনো নিঃশর্ত নয়…

যদিও আজন্ম লালন করেছি একটি সুবাসিত গোলাপ বাগান ও বর্ষাস্নাত মাধবীকুন্জ গহীন হৃদয়ে,
এবং
ভালবেসেই তো বুনেছিলাম এক রক্ত-গোলাপের কন্টকিত বীজ নীরব নিভৃতে!