পম্পা দেবের গুচ্ছ কবিতা

124

দোলাচল

অন্য কোনো মন খোঁজে মন…
অন্য দিকে,
হেঁসেলখানা পার হয়ে সে যাচ্ছে চলে
অন্য কোনো বাস্তুভিটায়,
বনবিহারী ডাকছে তাকে
চাঁদনি রাতে খরস্রোতায়
যেখান থেকে সহস্র মাইল দূরের পথে
পুরনো ঘর , কুমড়ো লতা
একশো বছর আগের কোনো পুকুর ঘাটে
মা-জ্যেঠিমার আঁচল থেকে গন্ধ ভাসে
মালতী ফুল , অতসী ফুল ,
পাখি ডাকে পাখি ডাকে
সেখান থেকে যাচ্ছে উড়ে অন্য বাসায়-
কাঁসা পিতল , সোনার চুড়ি
অন্য মনে খোঁজে কোনো হিসেব খাতা
বহুতলের ওপর দিয়ে যাচ্ছে হেঁটে
বহুদিনের পুরনো তার রান্নাঘরে ।
পুরনো মন পুরনো মন
ফরিদপুরে ইদিলপুরে ,
স্টিমার ছাড়ার শব্দ আসে
কাঠের জ্বালে রান্না হারায় ,
দেশ হারা যে ,
প্রকাণ্ড এক উনুন জ্বেলে ,
প্রতিদিনের রান্না সারে… মনে মনে..
মনে মনে …মনে মনে

মাদারি কা খেল

এখনো শবের বোঝা ফুরায়নি দুই তীরে
পোড়া গন্ধ নদীটির গায়

শাকান্ন প্রস্তুত অন্ধের সংসারে,
রিক্সাচালকের চাকায়

নিয়তি নৃত্যপর, পুরবাসী জানে সবে
কাশির শব্দে জাগে পাড়া

যোজন দূরের পথে সম্ভাবনা আছে
জানে শুধু অপেক্ষায় যারা

একটি সন্ধ্যাতারা দূরের আকাশে
একটি গোলাপ ফোটে অবেলায়

বারুদ খেলা

এই হেমন্তেও প্রাণ দিতে প্রস্তুত যারা ,
তারাও কি জানে , সেনাজন্মের কুহক
যে শিশুটি নিরাপদে পার হল আগুন বলয়
অন্য দিকে চলে গেল তার আয়ুরেখা
যে রয়ে গেল নিজভূমে
তার জন্য দোয়া রাখো মন্দিরে , দরগায়!

নিরক্ষরেখা বরাবর দ্বিধা জাগে ।
দূরের প্রান্ত থেকে কবেকার কাবুলিওয়ালা
অলৌকিক বালিয়ারি থেকে ঝোলা ভর্তি কিশমিশ, আখরোট, নিয়ে পসরা সাজিয়েছে ।

শ্রী

লাস্ট ট্রেনে লক্ষ্মীকান্তপুর
যে মেয়েটি নামল একা ,
ওর নাম ‘দ্বাদশীর চাঁদ’।
সারা অঙ্গে চুঁইয়ে পড়া শ্রমের সুবাসে
বঙ্গদেশের গোলা ভরে।

স্বপ্ন

একদিন অন্ত থেকে শুরু হবে উৎসব
জল থেকে উঠে আসা যোজনগন্ধায়
সেজে উঠবে বিবর্তনের ঘোড়া।
পৃথিবীর ফুসফুস অসুখ বিহীন হবে ফের..
ধর্ম বলতে শুধুমাত্র ‘ভালবাসা’ বোঝে যারা –
তাদের হাতেই যাবে শাদা পতাকার উড়ান।



পিতৃতর্পণ

(এক)

এখন আর থাকেনা বাবা ঘরে ।
এখন বাতাসের মতো, গাছেদের নিবিড়
ছায়ায় বাবা বসে থাকে । আমি তাকে মনে মনে দেখি নিত্যদিন । মা এসব বোঝেনা ; আজকাল ভুলভাল
কথা বলে। পন্ঞ্চাশ বছর আগেকার শাড়ির গল্প করে, রান্না চাপাতে যায় , প্রাচীন ফোড়নের গন্ধ ছড়ায়
কুমিল্লা থেকে বেলেঘাটা, ফরিদপুর থেকে সাঁত্রাগাছি।
সেইসব গল্প, না হয়ে ওঠা রান্না , বাবার দুর্গামন্ত্র উচ্চারণের ধ্বনি শরৎের মেঘে ভেসে ভেসে
আমাদের পবিত্র পরিত্রাণ হয়ে জেগে আছে।

(দুই)

বাবা আমাকে গাছ চিনিয়েছে শৈশবে
কোনটা ছাতিম, সপ্তপর্ণী , কোনটা জারুল,
অমলতাস।
আজ বাবা নেই কুড়িদিন হল।
অথচ বাগান জুড়ে, পৃথিবীর অরণ্যে
মাইলের পর মাইল দূরের পথে পথে
বাবা আমাকে গাছ চেনাচ্ছে রোজ ভোরবেলা।
গাছের গল্প বতে বলতে বাবা আমার বৃদ্ধ হলেন
এখন তাকে বটগাছ বলে ডাকি।

(তিন)

জন্মান্তরে খোকা হবে তুমি
জন্মদিনে পায়েস রাঁধব উনুনে
আগুনে পুড়ে পুড়ে দুধ থেকে সর উঠে আসবে
পুরু সরে জমে জমে ভরে উঠবে হাঁড়ি
পাড়া ঝেঁটিয়ে লোক আসবে নেমন্তন্নে
খুশিতে চোখের তারা চকচক করবে তোমার
আমি এসব চোখ মেলে দেখব।
মায়ের মতো ।

(চার)

কতদিন ভুলে গেছ শাল গায়ে দিতে
সেভাবে কখনো বোঝোনি শরীরের ক্ষত
নিঃশ্বাস নিতে বড় বেগ পেতে হয় আজকাল
কুয়াশা ভেঙে রোদ্দুর আসতে বড় দেরী
তুমি জানতেনা শীতকালে বেলা ছোট হয়,
ছোট হতে হতে এতটুকু বিন্দুর মতো পড়ে
থাকে প্রার্থনা ।

(পাঁচ)

বাবা তোমার বইপত্র, চশমা আমার সম্বল
তোমার ছেড়ে রাখা জামার পকেটে
পৃথিবীর মানচিত্র রাখা আছে।
আমি সেই কাগজ টুকরো খুঁজব বলে
সারা রাত্তির জেগে আছি।
ডেনমার্ক কত দূর ? কত দূর কপোতাক্ষের জল?
তোমার ছায়ার দৈর্ঘ্য মেপে মেপে
সেইসব হিসেব মেলাই।