জোহরা পারুলের পাঁচটি কবিতা

151

স্মৃতিতে এক নদী

আজকাল প্রায়ই স্বপ্নে সেই নদীটাকে দেখি
বিষন্ন ক্রন্দনরত
কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও শুকনো ।
আমি সেই হাঁটুসমান পানি আর শুকনো বালুর উত্তাপে
খুঁজি গহীন কালো পানির স্রোত,
একটা নৌকা খুঁজে বেড়াই সেই স্রোত পার হব বলে।

খটখটে শুকনো নদীটা দেখে বুকের ভেতর
গুমরে উঠে এক তুমুল স্রোতস্বিনী
বর্ষায় ভরা যৌবনে দু’কূল ছাপিয়ে যেত যার
যেখানে ডুবসাঁতারে কেটেছে আমার শৈশব।
আজ তার ধূ ধূ দেহ দেখে
আমার বেদনা যেন ক’ফোঁটা পানি হয়ে নামে,
তার হাঁটুজলে মিশে একাকার হয়ে যায়।

কেবলই পানি খুঁজতে থাকি আমি– গভীর কালো পানি,
আর খুঁজতে থাকি একটা নৌকা,
আমার স্মৃতির নদীটা পার হবো বলে।

বর্ষার স্বপ্ন

আমার নিদ্রার মধ্যে যেন কোনো নূপুরের গান,
রিনঝিন শব্দের ভিতরে আমি নেমে যাই,
বজ্রের গর্জনে ফের ভাসি।
বজ্রপাতের শব্দ যেন নরম কোন ঢেউ
আমাকে ভাসিয়ে দেয়
আরো দূরের কোন
নীল আঁধারের প্রবাহে।

যেন কোনো রাজহাঁস আমি কাটছি সাঁতার কতকাল,
কত কত কাল..
এই নীল জলের প্রবাহে।
হামাগুড়ি দিয়ে আমি তীরে উঠি।
তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে খুঁজি আমার ঘর,
দেখি সবই জলের প্রবাহ
নগরে নগরে ঘুরি, পুরোনো ঘরের খোঁজে
দেশ থেকে দেশান্তরে যাই।
দেখি আমি স্রোতেই ভাসমান,
কেবল একেক স্বপ্ন থেকে
জেগে উঠি আরেক স্বপ্নের ভেতর।

পর্যটক

এ অজানা ছোট্ট শহরে আমিই প্রথম আগন্তুক
পাহাড়ি পথ বেয়ে উঠছি,
চলেছি দূর এক প্রাসাদের দিকে।
এ অজানা প্রাসাদটির আমিই প্রথম পর্যটক
নিরুত্তর গ্রানাইট স্পর্শ করি,
শতবর্ষী পাথরের কান্না শুনি।

প্রাসাদের দীর্ঘশ্বাস তাড়া করে আমায়
পাহাড়ি পথে নেমে যাই ছোট্ট এক নির্জন স্টেশনে।
এ অজানা স্টেশনে আমিই প্রথম পরদেশী
নিঃশব্দে কান পেতে আছি
একটি হুইসেলের জন্য।

যে ট্রেনে আমি চড়েছি
তাতে আমিই প্রথম অজ্ঞাতনামা যাত্রী
চলেছি অজানার পথে।
ফসলের মাঠ, পাহাড়-
অরণ্য পার হয়ে
ট্রেন ছুটছে অবিরাম,
আর আমি প্রতীক্ষায় আছি
একটি নতুন প্রাণবন্ত স্টেশনের জন্য।

অনুপ্রবেশ

বিমুগ্ধ আমি তোমার অফুরান কথামালায়,
তোমার প্রাণশক্তিতে বিস্মিত!
নিজেকে কেবল তুলে ধরার চেষ্টায়
যে দৈন্য লুকিয়ে থাকে,
তা কি ভেবে দেখোনি কখনো?
মনের আয়নায় নিজেকে দেখে নাও
কি হারিয়েছো আর কিসের অভাব?
কোন শূণ্যতা জড়িয়ে আছে অনুভবে তোমার।

বয়ে চলা নদীর মত যতই ছলকে উঠ,
চরায় আটকে আছে তোমার নাও।
ডানা মেলে উড়ার পথে
পাখা দুটি হারিয়েছো সেই কবে
তবুও উড়ার ভংগিতে নিজ দিগন্ত ছাড়িয়ে
অন্য দিগন্তে তোমার চোখ।
অবাক আমি শুধু তোমাকেই দেখি,
কেবল তুমিই দেখনা তোমার ভেতরের বিরাট শূণ্যতা।

ভাবনাগুলো

ভেবেছিলাম সবুজ উপত্যকায় বসে
দূর পাহাড়ের হাতছানিতে সাড়া দেবো,
সাথী হবে নীল ঘাসফুল আর তুমি।
ভেবেছিলাম পাহাড়ের চূড়ায় দাড়িয়ে
মেঘেদের ভেসে যাওয়া দেখব,
বরফে রোদের বিচ্ছুরণ
মাখবো দুচোখের পাতায়।

ভেবেছিলাম পাতাদের রংবদল দেখব
শরতের নরম দিনগুলোতে,
কান পেতে শুনব শীতে ঝরে পড়ার আগে
তাদের শেষ গান,
ভিজবো জলপ্রপাতের জলকণায়;
এ গ্রহের প্রতিটি বৃক্ষকে ছুঁয়ে দেখবো ভেবেছিলাম।

প্রতিটি সমুদ্রে স্নান করব,
ঘ্রাণ নেব সকল ফুলের,
তোমার হাত ধরে হাটবো
গহীন অরণ্যের এক চিলতে পথ দিয়ে।
হ্রদের স্বচ্ছ জলে ভাসবো
পরিযায়ী পাখিদের মতো।

আরও কত কি যে ভেবেছিলাম!
ভাবনাগুলো কেবল অপাংক্তেয় হয়ে ঘুরে বেড়ায়
স্বপ্ন আর বাস্তবের দোলাচলে এলোমেলো হয়ে যায়।