অদিতি ফাল্গুনী এর গুচ্ছ কবিতা

145

ধূপকাঠি জেনো
ধূপকাঠি জেনো, তুমি জেনো সাদা ফুল-
মৃত্যু অশেষ, প্রাণঘাতী বীজাণু
তবু কাড়বে না- কাড়তে পারবে না
শেষকৃত্যের সমাহৃতি।
আলিওশা বলে, ‘শোন হে ইভান!
ও নিরীশ্বরবাদী,
মৃতের আত্মার সদ্গতিতে
প্যান কেকে দোষ নেই।‘
আলো ও আয়োজন পাশাপাশি চলে
চিরকাল হাত ধরে।
আতশবাজি, বীজাণুর ভীতি
বিধবার সাদা শাড়ি
মৃত্যু অশেষ, মারণব্যাধি
তবু কাড়বে না, কাড়তে পারে না
শেষকৃত্যের সমাহৃতি।
ধূপকাঠি জেনো, তুমি জেনো সাদা ফুল।

মৃগয়া
মহারাজা দুষ্মন্ত,
মৃগয়ায় এসেছেন এই তপোবনে-
বধ করবেন হরিণী?
নয় সে ত’ গ্রিক দেবী আর্তেমিসের সোনার হরিণী?
সেরনিয়ার সোনার হরিণ?
রাজা ইউরিসথিসের কথায় যাকে বন্দী করেছিল
মহাবীর হারকিউলিস?
অথবা রাক্ষস মারীচ যেমন স্বর্ণমৃগ সেজে
অরণ্যে এসেছিলেন সরলা সীতাকে বিভ্রান্ত করতে?
অগ্রজ রাবণের আদেশক্রমে?
কোন্ হরিণীকে আপনি বধ করবেন রাজা দুষ্মন্ত?
এই শকুন্তলা অনভিজ্ঞা
আর লজ্জিত বোধ করছে আপনাকে দেখে,
যদিও মিরান্ডা লজ্জিত হয়নি ফার্দিনান্দকে দেখে?
(যেমনটা বলবেন বঙ্কিম?)
‘তোরা যে যা বলিস ভাই,
আমার সোনার হরিণ চাই!
বুনো হরিণ চপল চরণ সোনার হরিণ চাই)!’
মৃগয়া শেষে ফিরে কি যাবেন নগরীতে, রাজন?
রাজপ্রাসাদে? ভুলে কি যাবেন আপনার প্রদত্ত অভিজ্ঞান?
অথবা আফ্রিকীয় ভুডুমন্ত্রের মত
তুলট কাগজে আগে এঁকে নেবেন এক বিভ্রান্ত হরিণী
আর তারপর তীরবিদ্ধ করবেন তাকে?

সমুদ্রব্রাজক ম্যাগিলান দ্য ড্রেক-কে
সম্পর্কের সুগন্ধী দারুচিনি দ্বীপ ও কমলালেবু বনে
আপনি টেনে নেবেন না আমায়
ও ম্যাগিলান দ্য ড্রেক….
অভিজ্ঞ নাবিক,
দেখেছেন বহু বহু বছর ধরে সমুদ্রের পাল্টে যাওয়া বিচিত্র রং,
চিনেছেন কুজ্ঝটিকা…শীতল ও তপ্ত উর্মিমালা…
আমি ত’ নি:সম্পর্কিত নারী এক…
আগে ও পেছনে আমার বলতে গেলে তেমন কেউই নেই,
ছিল না কোনদিন…
আজীবন কাটিয়েছি একাকী তপশ্চর্যায়…
আপনার অর্ণব পোতে তুলে আমাকে নিয়ে যাবেন বুঝি এক উত্তমাশা অন্তরীপে?
আর তারপর বিক্রি করে দেবেন কোন ক্রিতদাসীর বাজারে?
আমাকে ভাসিয়ে নেবেন না দয়া করে
আপনার গর্জনশীল চল্লিশায়…

মশলা যুদ্ধ
বিশ্বাস করতে নেই কোন দুষ্মন্তকে,
অথবা ম্যাগিলান দ্য ড্রেককেও…
ওরা শিকারী, মৃগয়ায় আসে,
মৃগীকে বধের লক্ষ্যে,
অথবা উত্তাল বাণিজ্য বায়ুতে ভাসায় জাহাজ
মশলা যুদ্ধ জিতবে বলে।
ঢের ত’ বিভ্রম হলো,
রাজবিদ্বেষী, অকুতোভয় বিদ্রোহী ভেবে
যাকে দেবে ভেবেছিলে বৈজয়ন্তী মালা,
গোপণে সে নগরীর সব অমাত্যেরই বন্ধু,
সব শ্রেষ্ঠীর স্ত্রীরই সে উপপতি- গোপণ প্রেমিক।
কুমারী মেয়েদের যে ঘৃণা করে আর
পরস্ত্রী ছাড়া যার অন্য রুচি নেই?
আর তোমার বীণা বাদনের প্রশংসা করেছিল যে সভাকবি
বহুদিন হয় ভিনদেশী এক সওদাগর কন্যাকে বিয়ে করে
সে পরদেশেই প্রতিপালিত,
বিশ্বাস কি এই নতুন শিকারীকেই?
নতুন বণিককে কেন করবে আস্থা?
কেন ফিরে যাও না সেই শান্ত, অধ্যয়ণশীল তরুণের কাছে,
তোমার দীর্ঘ খামখেয়ালীপনায় পুঁথি আর
অসংখ্য রাজকাহিনী ঢেকে দেয়া বল্মীকের স্তÍপই
যার আরাধ্য হয়েছে?

বাতাসের কুমার
তারপর? বাতাসের কুমার এসে বলেছিল,
‘আমাকে যেদিকে ভাসিয়ে নেবে,
সেদিকেই যাব!’
মেয়েটি থমকায়।
ছেলেটি ভগ্ন দুর্গের চারপাশে পাক খেতে খেতে ভাবে,
‘হলোই বা অস্পর্শিত- মন ওর থেকে থেকে হয়নি কি বেপথু?
উনপ াশ পবনের সাথে সাথে?
নিজেই তার স্বরে সেসব স্বীকারও করে।
ওকে দেখাই বরং আমার অতীতের সঙ্গীনীদের প্রতিকৃতি?’
মেয়েটি নরম হাসে,
‘দোষ কম করিনি ত’…
ঘুরেছি বিভ্রান্তির আলেয়ায় শুধু…
প্রায় দু’টো দশক যে সবচেয়ে কষ্ট দিয়েছে,
তার পিছে ঘুরেছি সবচেয়ে বেশি…
কষ্ট দিয়েছি ভাল আত্মাদের!
এখন এ অভিশাপ প্রাপ্য আমার।’
ওদিকে যে বণিককে ভুলতেই বসছিলাম,
পর্তুগীজ জলদস্যু সেই ম্যাগিলান দ্য ড্রেক…
অথবা রাজা দুষ্মন্তই হবেন?
এক এক যুগে তাঁর এক এক বেশ…
পরশু এসেছিলেন এক ভিন্ন ছদ্মবেশে…
আর কি ভুলি?
যাব না কোথাও আমি…কারো কাছে…
ভুলে গেছি সেই স্তাবক বীণাবাদক,
সদা ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত কোন এক অত্যাচারী যুবক,
ভুলে গেছি এই বাতাসের কুমার
অথবা গর্জনশীল চল্লিশায় পাল তোলা
মৃগয়ায় নামা কোন দুষ্মন্ত বা ম্যাগিলান দ্য ড্রেককেও…

ক্ষমা
আর সেই হ্রদের কথাও বললে নাতো?
যে না চাইতেই তোমার পায়ের কাছে জড়ো করছিল,
শৈবালদল, সবুজ পান্নারাজি?
তুমি লক্ষ্যই করোনি শুরুতে!
ক্রমাগত বালু খুঁড়ে চলছিলে কৃপণ, সন্ধিগ্ধ নদটিতে,
সে ত’ অশ্বখুরাকৃতি হয়ে ততদিনে মরেই গ্যাছে
আর পাল্টাচ্ছে খাত…
সত্যি বলতে সে তোমার কাছে কোনদিন জীবন্ত হতেই চায়নি!
তবু যেই না সেই নতুন, চ ল নদ অথবা হ্রদের ঢেউ এসে
তোমার পায়ের কাছে জড়ো করলো শৈবালদল আর সবুজ পান্নারাজি,
কৃপণ, সন্ধিগ্ধ হ্রদটি চেঁচিয়ে তোমাকে বলতে থাকলো,
‘নর্তকী! চরিত্রহীণা!’
এমনি নানা ভয়ানক সম্ভাষণ!
ধ্যানস্থ হ্রদটি তেমন মৌনই রইলো,
তার চাপা দু:খ বোঝাও গেল না…
নতুন চ ল হ্রদ কিছুই বুঝতে না পেরে
আর এক শাখা নদীর সাথে মিলিত হয়ে
চলে গ্যালো বহু দূর,
কাস্পিয়ান সাগরের পাড়ে…
বোকা মেয়ে…তুমি কিছু না বুঝেই ক্ষমা চাইলে
বালুর পুকুরের কাছে,
সে দাঁত-মুখ খিঁচিয়েই চললো…
এরই মাঝে এলো আর এক প্রবলতর সমুদ্রের ঢেউ
আর ভাসাতে চাইলো তোমাকে…
তুমি ভেসে যেতে যেতেও তীরে দাঁড়িয়ে পড়লে
আর ভাবলে ফিরবে তোমার শৈশবের সেই ধ্যানস্থ হ্রদটির কাছে,
যদিও সে কি আর করবে ক্ষমা? করতে পারে?

ওথেলো
বহু দিন পরে ঘরে ফেরা ইয়াগো,
জ্বলছে অপমান আর তীব্র প্রতিশোধে,
সাতশ সনেট লিখেছিল সে দেসদিমোনার জন্য…
মেয়েটি তবু ভালবেসেছিল গোঁয়াড় সেই মুরকেই?
ভালবেসেছিল তবু মুরটি বিশ্বাস করেনি ত’ তাকে,
তাড়িয়ে দিয়েছে দূর দূর করে- মুরের যেমন রীতি!
এত দিন পরে ভিন দেশ থেকে ঘরে ফিরেছে ইয়াগো,
শুনেছে গোঁয়াড় মুরটি নাকি ভুল কিছু তার বুঝছে!
চতুর ইয়াগো পুনরায় হায় রচে তার পদাবলী!
দেসদিমোনাকে পেয়েছে সে- দিয়েছে নিভৃত অঞ্জলী।
বোকা ওথেলো- সতেরো বছরের ভুল বুঝবার পরও
আবার রেগে যায়, সন্দেহে কাঁপে, ঈর্ষায় মরো মরো।
পায়রার খোপ
ভুল সময়ে ভুল কথা বলা,
তবু কি করা?
পায়রারা কি থামাতে জানে
কূজন তাদের?
পনেরো দিনের আড়ি ভেঙ্গে
পায়রা দু’টো উড়তে উড়তে
আবার একই চবুতরায় দেখা হলে,
গমের দানা খুঁটে খেতে খেতেই
বাকবাকুম…থামে কি আর কূজন তাদের?

রামায়ণের যেটুকু লেখা হয়নি
সত্যিই কি রামের শস্ত্রাঘাতে নিহত হয়েছিলেন রাবণ?
লঙ্কার অন্তিম যুদ্ধে? অথবা শর্ত সাপেক্ষে…
রাজত্ব বিভীষণকে বুঝিয়ে দিয়ে চির নির্বাসনের শর্তে
বেঁচে গেছিলেন আহত রাবণ? তারপর?
বহু দিন পর আবার ভিখিরীর ছদ্মবেশে ফেরেন অযোধ্যায়,
যদি করুণাময়ী জানকী, পাওয়া যায় নি যাকে..
ছলনাময়ী ভিখিরির ভিক্ষার আবেদেন দেন সাড়া?
পা রাখেন গন্ডির বাইরে?
তবে সে অবকাশ পান না রাবণ।
কারণ ততদিনে জানকিকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন রাম…
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস
আর বছরের পর বছর জানকি থাকেন অরণ্যে
ভ্রষ্টতার অভিযোগে…
আজকাল মাঝে মাঝে এমনও ভাবনা হয়
তবে কি রাবণই বেশি ভালবেসেছিলেন তাঁকে?
আবার ভাবেন বীরপুরুষই প্রার্থিত এমন শিক্ষা থেকে
মিথিলার যে তরুণ পন্ডিতকে চোখে দেখেও দ্যাখেন নি,
সে কি আজো অকৃতদার? আজো কি পড়াচ্ছে সে তার ছাত্রদের?
কতটা বয়স হয়েছে তার? আর সেই যে এক শ্রেষ্ঠীপুত্র
সার্থবাহ দলের সাথে একবার মিথিলার রাজসভায় এসেছিল…
রাজকন্যাদের জন্য চীনাংশুক, প্যাপিরাস নিয়ে?
হাসি-খুশি, উজ্জ্বল সেই শ্রেষ্ঠীপুত্র কোথায় হারালো?
এখন এই নির্বাসনে থাকতে থাকতে…
ঐ যে ভাস্কর এক দূর থেকে অরণ্যচারীনী সীতাকে দেখতে দেখতে
তার ভাস্কর্য গড়লেন, আঁকলেন তাঁকে পটে ও চিত্ররেখায়…
সত্যিই তাঁর কাছে ছুটে যাবেন কি তিনি সমাজের সব নীতিবাক্য উপেক্ষা করে?

দুর্গা/দেসদিমোনা
ওথেলো/মহিষাসুর: শোন দেসদিমোনা,
তোমাকে হত্যা আমার করতেই হত-
কিছুতে আস্থা পাই নি,
আমি নিকষ কালো মুর,
মহিষাসুর!
তোমাকে হত্যা না করলে
একদিন তুমিই উল্টো বর্শাবিদ্ধ করতে না আমায়,
তার বিশ্বাস কি?
ক্যাসিওকে দেখলেই অমন গলে যাওয়া হাসি,
আমি কটু গন্ধ, কালো মুর…
সহ্য হয়নি পিশাচিনী সেই গলে যাওয়া হাসি…
তাই উল্টো তোর গলা টিপে ধরি…
সাদা মানুষের মেয়ে, তোমায় বিশ্বাস কি?
দুর্গা/দেসদিমোনা
মূঢ় তুমি মুর, ও মহিষাসুর!
জানো না সহবত, শিক্ষা-দীক্ষা,
কারো সাথে হাসলেই শয্যা ভাবনা
একান্তই পাশবিক- মূঢ় মুর ও মহিষাসুর!
তাই আমি মধ্যযুগের বোকা মেয়েটি নই…
সরে এসেছি-এসেছি আবার আসিনি,
নিশ্চুপ পুতুলের মত জড় হয়ে আছি বহুকাল,
তোমার পেশল বাহু, ঝাঁকড়া চুল
অমন ঈর্ষা মাখা প্রেম ভাল লেগেছিল,
ভয়ও লেগেছিল…নিহত হব না বলে কাছেই ঘেঁষিনি,
ছিল চতুর ইয়াগো, ক্যাসিওর মতই সরল ও ভাল
কেউ কেউ আজো আছে…
তবু তোমাকে ভাবি আমি মুঢ় মুর- মহিষাসুর!
মহিষাসুর : বিশ্বাস করি না তোকে- কখন না উল্টো আমাকেই হত্যা করতি!
দুর্গা/দেসদিমোনা: অবশ্য পুরো মুর নও তুমি,
কালো অর্থেই লিখেছিলেন কি শেক্সপীয়র?
ঈর্ষা আর অধিকার বোধে উন্মাদ তুমি শ্যাম বর্ণ থেকে কালো হয়ে যাও,
(খুব রাত জাগা? গাঁজা খাস নাতো?
মদও চলছে বুঝি? পয়সা নেই?
কে দেবে স্মিরোনফ কিনে? বাংলা খাস বুঝি?)
সেদিন দেখলাম একটি ছবি তোর
ভক্তরা তোর দিয়েছে ইউটিউবে,
পুরো পুর মুর তুই মূঢ় ও মহিষাসুর!
মুর/মহিষাসুর: ক্যাসিওর সাথে অত কি হাসি ছিল তোর?
সাদা মানুষের মেয়ে? এই গলা টিপে ধরলাম তোর।
দেসদিমোনা: যত গলা টিপে ধরো,
বিশ্বাস ও সরলতা আমাকে করবে শ্বেত থেকে আরো শ্বেতকায়া…
শুভ্র থেকে আরো শুভ্রতরা…ত্বকে নয়…অনন্ত হৃদয় জ্যোছনায়!


ফুজিয়ামা
পুরণো প্রেম যেন বা সুপ্ত আগ্নেয়গিরি…
যেন বরফে ঢাকা ফুজিয়ামা,
অথচ যে কোন মূহুর্তে হতে পারে তপ্ত ভিসুভিয়াস,
পুড়িয়ে ফেলতে পারে পম্পেই,
বহু শতাব্দী পরে মৃত্তিকার গভীর আস্তরণ থেকে পুরণো শহরের কঙ্কাল
আবিষ্কার করবে কোন্ প্রতœতাত্ত্বিক?
এ্যাক্রিলিকে
আমার অস্পষ্ট মুখ এ্যাক্রিলিকে এঁকেই আপনি পালিয়ে গেলেন…
সেই আজারবাইজানী গল্পের চিত্রশিল্পী ছেলেটির মত,
না চেয়ে বা না জেনেই একটি মেয়ের মুখ সে এঁকে ফেলেছিল
আর তারপর বহুদিন স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছিল শহর থেকে,
সমস্যা নেই…সে ছবি লুকিয়ে রাখুন,
বহু বহু শতাব্দী পরে মেইলে পাঠিয়েন সেই শিরোনামহীন এ্যাক্রিলিক,
যেন আলোকবর্ষের এপার ওপার থেকে
পরষ্পর কথা বলা যায়…বলতে পারি!

অদিতি ফাল্গুনী : কবি, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক। গল্প, কবিতা, অনুবাদ, উপন্যাস ও শিশু-কিশোরদের জন্য রচনা মিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা: ৩৩। পুরষ্কার: ০৪। কাজ করেছেন ও করছেন একাধিক সংবাদপত্র, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায়।