মালেকা পারভীন এর চারটি কবিতা

141

কী লিখলাম কে জানে

আজকের দুপুর বেজে তিনটা দশ।
ক্রমাগত উপর-নিচে ফ্লাই ওভারের চক্করে ঘুরে
একসময় ঠিক পৌঁছে যাই
কাকরাইলের এক জনাকীর্ণ রাস্তায়।

কিছু লোককে দেখি পরম আয়াসে
শীত-দুপুরের কুসুম রোদ গায়ে মেখে
চুকচুক আনন্দ নিয়ে চা পানে মগ্ন।
এমন দৃশ্য, খুব বেশি তাৎপর্যপূর্ণ

নয় তো তেমন, হয়তো, বিশাল জীবনের
খাঁজকাটা মাপকাঠিতে, দেখে আমার
চোখ ভরে যায়, মন তো বটেই।
ভাবি, এখনো কোথাও তবে

জীবন আছে ছিটেফোঁটা বেঁচে
হাওয়াই মিঠাই রোদের আঁচে।
এক কামড় বান রুটি আর
এক ঢোক চায়ের স্বাদে,

অফুরান তৃপ্তি সহযোগে।
আজই শুনলাম এক জ্ঞান-সমৃদ্ধ সেশনে,
আমার দেশের মানুষের Resilience এর কথা,
আগেও শুনেছি বহুবার বিবিধ প্রসঙ্গে।

Resilience কী? Resilience হলো
Survival of the fittest আর
অনায়াসে করোনার মতো অতিমারি
উপেক্ষা করে সবুজের উৎপাদনে

উদগ্রীব কৃষি-কাব্যের কবি।
তাঁদের মতো আরো আরো
শিল্পের কারিগরসকল।
সতের কোটি মানুষের মুখে ভাত।

যা হোক, এসব ভাবতে ভাবতে
আমি কল্পনায় দেখি,একদিন ঠিক
কাকরাইল বা পল্টন বা সেগুন বাগিচার
কোন রাস্তা ঘেঁষে দাঁড়ানো

চায়ের দোকানে নেমে
এক গ্লাস লিকার চা হাতে
যথারীতি বনে গেছি দার্শনিক বিশেষ।
জীবন এক ঘোরলাগা দর্শন বৈকি,

আধো আধো চুমুকে যার
চলমান উদযাপন ভীষণ,
নির্বিকার, প্রশ্নহীন!

নস্টালজিয়া

এতো কিছু ঘটে যায়
এক ক্ষুদ্র ভব জীবনে!
এতো দৌড়, অস্থিরতা!
তারপর থাকে যেন কী?

এক সুনসান নীরবতা…
চোখের আড়াল আর
মনের দেয়াল ভেঙে
ভাসে স্মৃতি ধূসরতা…

তারপর আর কিছু নেই…
তারপর আর থাকেনা কিছুই-
শুধু সামান্য স্মৃতিটুকু
মিশে যায় মাটিতেই…
একটি ছবি ধূলিম্লান,

ভুলে যাওয়া কোন
গান বাজে অস্পষ্ট সুরে,
ফেলে আসা দূরে, বহু দূরে-
একটি রকিং চেয়ার,

দুলে ওঠে স্মৃতি ফুঁড়ে
সময়ের হাহাকার।
দাগ উঠে যেতে যেতে
পুরনো চিঠির পাতায়

লেগে থাকা স্পর্শ তার।
ন্যাপথালিন গন্ধকাতর,
আর কখনোই আসেনা
ফিরে অতীতের দাবিদার।

অজ্ঞাতনামা কাউকে

যদি এই পড়ন্ত যৌবন বেলায়,
যদি এই যৌবনের পড়ন্ত বেলায়,
যদি এই চলে যাওয়া সময়ের সিঁড়িতে
বসে কিছুক্ষণ ভাবি আমি কিছু কথা,

যদি খানিকটা উন্মনা হই উদাসী ভাবনায়,
যদি অল্পস্বল্প কিছু রঙিন স্বপ্নের ঘোর লাগে
ঈষৎ ধূসর হয়ে আসা চোখের তারায়,
যদি এই রোদ-আলো-ছায়া মাখা

ঝুলবারান্দা ঘেঁষে একটু দাঁড়াই
আর যদি দাঁড়িয়ে থাকি আমি
শুধু তোমার অপেক্ষায়,
তাহলে কি খুব বেশি
চাওয়া হয়ে যায়!!!

অজ্ঞাতনামা কাউকে

এই ভুবনের ভরা জনসমুদ্র সেঁচে
তোমাকে আর পাবোনাকো কোনদিন,
তবু ফিরে যাওয়া হারানো স্মৃতির কাছে,
না পাওয়ার বিষে হয়ে ওঠা শুধু নীল।

এখনো মর্মে হানা দাও বারবার,
খুঁচিয়ে তোল বিষাক্ত ক্ষতের জ্বলন।
তোমাকে দিয়েছি কবেই মুক্তিসনদ,
বিনিময়ে নিয়ে একাকী থাকার মরণ।

তবু তুমি আসো, তবু তুমি হাসো-
আমার সব টুকু থাকো জুড়ে,
অথচ আমাকে কাছে না টেনে
না ভালোবেসে দিয়েছ ছুঁড়ে।