মহামারির ভূত প্রজিতবিহারী মুখোপাধ্যায় উনিশ শতকের শেষের দিকে কথা

190

উনিশ শতকের কৃষ্ণনগর থেকে বিশ শতকের বর্ধমান, সর্বত্র ছড়িয়েছে এই কাহিনি মহামারির ভূত প্রজিতবিহারী মুখোপাধ্যায় উনিশ শতকের শেষের দিকে কথা। জামাই সরকারি কাজ করেন, হিল্লি না দিল্লি কোথায় যেন থাকেন। তাই শ্বশুরবাড়ি বিশেষ আসা হয় না। স্ত্রী অপেক্ষায় থাকেন বাপের বাড়িতেই। বহু কাল বাদে, অবশেষে মিলল ছুটি। জামাই শ্বশুরবাড়ি এলেন। শ্বশুর, শাশুড়ি, স্ত্রী সবাই অভ্যর্থনা করলেন। তবু কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে। চার পাশটা যেন বড্ড নিশুতি। গ্রামের বাকি লোকজন সব কি সাততাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল না কি! তা কী আর করা? পথের ক্লান্তি এবং এত দিন বাদে প্রিয়তমার দেখা পেয়ে জামাই আর অত মাথা ঘামান না। স্নানাদি করেই বসে যান খেতে। যথারীতি ধূমায়িত ভাত আর সঙ্গে রয়েছে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়। তবে প্রথম গ্রাসটি রসনাগ্রে দিয়েই জামাইয়ের মনে হল, একটু নেবু থাকলে আর জমত খাওয়াটা। স্ত্রীকে বললেন, “হ্যাঁ গো, একটা লেবু দেবে?” স্ত্রী তো খুবই লজ্জিত। বললেন, “এ মা, ভুলে গেছি! এই দিচ্ছি।” বলেই জানলা দিয়ে বাড়িয়ে দিলেন হাত পাশের মাঠের লেবুগাছটার দিকে। জামাইয়ের মুখের গ্রাস মুখেই রয়ে গেল। গেলা আর হল না। হবে কী করে? লেবু গাছটা যে প্রায় ২০ গজ দূরে! মানুষের হাত অমন লম্বা হয় না কি? ব্যস! জামাই তো অজ্ঞান। জ্ঞান ফিরতে পড়শিরা বললেন, “খুব বেঁচে গেছ বাছা। তোমার শ্বশুরকুল তো কবেই কলেরায় গত হয়েছেন। যাঁদের দেখেছ তাঁরা সবাই প্রেতযোনি।” আমার মতো আমার বয়সি অনেক বাঙালিই হয়তো ছোটবেলায় এ গল্প পড়েছেন। কারও কারও স্মৃতিতে হয়তো আজও জাগ্রত রয়েছে গল্পের সঙ্গের আঁকা ছবিখানা। তবে এই গল্প কিন্তু বিশ শতকের গল্প নয়। এ গল্প প্রথম শোনা যায় ১৮৮০ নাগাদ। এবং এতে আশ্রিত উনিশ শতকের কলেরা এবং ম্যালেরিয়ার জনপদবিধ্বংসী একাধিক মহামারির সামাজিক স্মৃতি। স্মৃতি ব্যাপারটিকে আমরা প্রায়শই শুধু নিছকই ব্যক্তিগত বিষয় বলে ধরে নিই। বিশেষজ্ঞরা কিন্তু এ বিষয়ে অন্য মত পোষণ করেন। ফরাসি দার্শনিক মরিস হালবোয়াক্স প্রথম স্মৃতির এই গোষ্ঠীগত রূপের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন যে, স্মৃতি সব সময়ই গোষ্ঠীগত, এবং তা নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক পরিকাঠামোর উপর। এই ‘গণস্মৃতি’-ই আমাদের শিখিয়ে দেয় কী মনে রাখব এবং কেমন করে মনে রাখব। দৈনন্দিন জীবনের নানা ছোট-বড় ঘটনার অবিশেষ ধারাকে বিশেষায়িত করে ব্যক্তিগত স্মৃতি তৈরি হয় আসলে গণস্মৃতির উপর জোর দিয়েই। হালবোয়াক্স-এর পরবর্তী কালের গবেষকরা এই গণস্মৃতির হদিস দিতে গিয়েই প্রায়ই খুঁজে পেয়েছেন নানা রকম ভূতের গল্প। বহু দেশের গবেষকরা দেখেছেন কেমন করে ভূতের গল্পের মধ্যে দিয়ে সমাজ গণস্মৃতি গঠন এবং চর্চা করে। তারই মধ্যে অন্তর্নিহিত থাকে সেই সমাজটির আত্মসত্তা। প্রতিটি নতুন প্রজন্ম বিগত প্রজন্মের সামাজিক সত্তার সঙ্গে নিজেদের গোষ্ঠীগত সত্তাকে জুড়তে শেখে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিছু গণস্মৃতির মাধ্যমে। এবং শুনলে হয়তো অনেকে অবাক হবেন, এই উত্তরাধিকারের একটি বড় অংশই হল ভূতের গল্প। ত?? বে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, এ সব গল্পের মধ্যে দিয়ে যে ঠিক কিসের স্মৃতি ধারাবাহিত করা হচ্ছে, সেটা কিন্তু সব সময় ঠিক পরিষ্কার নয়। ভূতের গল্প গণস্মৃতির ধারক মানে যে, তা কেবল আমাদের ব্রহ্মদত্যি বা শাঁকচুন্নি চিনতে শেখাচ্ছে, তা কখনও নয়। বাংলা, কিংবা সংস্কৃতে, ‘ভূত’ শব্দটিরই তো দুটো পৃথক অর্থ। এক দিকে তার মানে নিছক প্রেত বা বিদেহী আত্মা। কিন্তু অর্থান্তরে ভূত মানে সমগ্র অতীত। তাই ভূতের গল্প কখনওই কেবল প্রেতযোনির আখ্যায়িকা নয়, তা ধারাবাহিত করে সেই সব মূল্যবোধকেও, যারা অতীতের সামাজিক সত্তার কেন্দ্রবিন্দু গঠন করে। জামাইয়ের লেবু চাওয়ার গল্পটাই ধরা যাক। এর মধ্যে ছোট বড় নানা মূল্যবোধ ও সামাজিকতার হদিস লুকিয়ে আছে। জামাইয়ের শ্বশুরকুলের প্রতি কর্তব্য কী হওয়া উচিত, শ্বশুর-শাশুড়ির জামাইয়ের প্রতি কেমন আচরণ করা উচিত, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, এই সবই তো আমরা শিখেছি ছোট বেলায় এই সব গল্পের মাধ্যমে। তার সঙ্গে এটাও শিখে গেছি যে, এই সমস্ত সম্পর্ক এবং আনুষঙ্গিক কর্তব্যের উপর অভাবনীয় চাপ সৃষ্টি করেছিল উনিশ শতকে একের পর এক আসা মহামারি। কলেরা বস্তুটি যে ঠিক কী, খায় না গায় মাখে, তা জানার আগেই বাঙালি খোকা-খুকুরা ভূতের গল্পের মাধ্যমে জেনে যেত যে, তাতে আমাদের অনেক পূর্বপুরুষের প্রাণ গেছে। তবে তারা এও শিখেছিল যে, মড়কের চাপে আমাদের সমাজ ধ্বংস হয়ে যায়নি। মৃত্যুর পরেও আমাদের পূর্বপ্রজন্ম তাঁদের সামাজিক কর্তব্য পালন করেছেন। এই পাঠ গ্রহণের মধ্য দিয়েই তো আমরা আমাদের অতীত ঠিক কী ছিল, আমাদের সামাজিক কর্তব্যগুলো কী রকম এ সব শিখি। তারই সঙ্গে এও শিখি যে, যারা ওই সব মহামারির মুখোমুখি হয়েছিল, তাদের আমরা ব্যক্তিগত ভাবে না চিনলেও তারা আমাদেরই সমাজের অন্তর্ভুক্ত। ফলে নির্মাণ হয় অতীত এবং বর্তমানকে বেণীবদ্ধ করে আমাদের আত্মসত্তা। ত?? বে গণস্মৃতি কোনও দিনই স্থবির নয়। যখনই সমাজের অবয়ব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়, তার সঙ্গে স্মৃতির রংগুলোও বদলায় ক্রমশ। ১৮৮০-৯০ সালে কৃষ্ণনগর অঞ্চলে জামাইয়ের গল্প শোনেন কৃষ্ণনগরের মহারাজার বিখ্যাত দেওয়ান, কার্তিকেয়চন্দ্র রায়। তবে সেই গল্পের সঙ্গে আমার ছেলেবেলার গল্পের বেশ কিছুটা ফারাক রয়েছে। দেওয়ান সাহেবের শোনা গল্পে ভূতের দেখা মিলেছে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছনোর অনেক আগেই। শ্বশুরবাড়িগামী জামাইবাবাজি পথে সন্ধে হয়ে যাওয়ায় একটি অচেনা গ্রামে আশ্রয়ের খোঁজ করেছেন। বহু হাঁকডাকের পর, শেষে গ্রামের একটি প্রাচীন অট্টালিকাতে এক অসুস্থ বৃদ্ধ তাকে আশ্রয় দেন। পরে যথারীতি লম্বায়িত হাত দেখে জামাই বোঝেন, বৃদ্ধ হলেন কলেরা বা ম্যালেরিয়াতে মৃত প্রেত। বৃদ্ধ তখন বুঝিয়ে বলেছেন যে, ভয়ের কারণ নেই। প্রেত হলেও বৃদ্ধ কখনও ব্রাহ্মণসন্তানের অনিষ্ট করবেন না। কিন্তু জামাই যখন তাঁর কেউ নয়, তা হলে কেনই বা বৃদ্ধ এত যত্ন করে তাকে আশ্রয় দিলেন বা তার খাওয়াদাওয়ার জন্য এত ব্যস্ত হলেন? আবারও উঠে আসে জামাইটির বর্ণের সংসর্গ। বৃদ্ধ জানান যে, ব্রাহ্মণ অতিথিকে দোর থেকে ফেরাতে নেই এবং ব্রাহ্মণ অতিথিকে উপবাসী রাখা তো মহাপাপ। তার সঙ্গে অবশ্য বৃদ্ধের একটি অনুরোধও ছিল। তিনি এবং তা