আত্মজীবনী এমনই হওয়া উচিৎ

159

সতীর্থ আহসান

কোন ভান নাই, নিজেকে উগ্রভাবে উপস্থাপন করার প্রয়াস নাই, নাই আমি এবং আমার বংশের লোক সেরা– এইসব বাকোয়াজি জাহির করার প্রবণতা। কী আছে এই বইতে? একটা অনাথ মেয়ের জীবনী এইটা। যে কিনা কালে কালে দুনিয়া কাঁপানো নায়িকা হয়ে উঠে। এত সৎভাবে নিজেকে উপস্থাপন করা জীবনী আমি আর পড়ি নাই। নাম মেরিলিন মনরো। সে বলছে, সে নিজের চেহারা দেখাইয়া আনন্দ পাইতো। সে ইচ্ছা করে যেকোনো প্রোগ্রামে লেট করে যাইতো। যাতে লোকজন অধীর হয়ে অপেক্ষা করে। এইটা করে সে প্রভূত আনন্দ পাইতো। কারণ, তার প্রতি এই দুনিয়ার এযাবৎ কালের এত এত অবজ্ঞা আর এত বঞ্চনার জ্বালাটা প্রশমিত হতো এতে। সে বলেছে, সে যার তার সাথে শুইতে পারত না। যার প্রতি ভালোবাসা নাই, মিলিয়ন ডলারেও সে শুতো না। এর পেছনে কোনো মরালিটি টরালিটি কাজ করত, এমন না। আসলে সে সিম্পলি ওই কাজটা করতে পারত না। কী সহজ স্বীকারোক্তি। আমার মনে আছে, এক লোককে অনেকগুলা টাকা ফেরত দেবার পরে লোকজন আমার সততার প্রশংসা করতেছিল। আমার খুব বিব্রত লাগতেছিল। আমি জানি আমি কী। ওই যে টাকাটা ফেরত দিলাম ওইটা আমার সততার কারণে না। ওইটা আমার প্রবণতা। মানে ওই কাজ করার ফলে সে যে আনন্দ আর স্বস্তি পাবে এইটা দেখার লোভে এতগুলা টাকা ফিরাইয়া দিছি। আত্মতৃপ্তি পাবার লোভে। এতে আমার তো কোনো ক্রেডিট নাই। যদি এমন হতো, আদতে আসলে আমি একজন ক্রিমিনাল বা অসৎ চরিত্রের লোক, কিন্তু মন থেকে ভাল হতে চাই। তাই নিজস্ব প্রবণা বা অনুভূতির বাইরে গিয়ে ওই টাকাগুলা ফিরিয়ে দিছি, তাইলে এটা হতো প্রশংসিত হবার মতো। এই সহজ স্বীকারোক্তি অধিকাংশই দেয় না। কিন্তু মেরিলিন মনরো ৩৭ বছর বয়সে মরে যাওয়া অসাধারণ মানুষটি দিয়েছেন। বলেছেন, নেকড়েকে কীভাবে হ্যান্ডেল করতে হয় তা জানি। কিন্তু ভয় পাই যারা ভিতরে একটা নেকড়েকে পুষিয়ে রেখে আদুরে বিড়ালের মতো কাছে এসে গা ঘঁষে। এইসব বই পড়লে খুব শান্তি লাগে। যেন সততার সাথে কেউ নিজেকে খুঁড়ে খুঁড়ে তার ভিতরের ক্ষত আর অনুভূতিগুলো দেখাচ্ছে। এইসব বই পড়লে বুকের মধ্যে একটা উষ্ণমণ্ডলীয় ভূখণ্ড জন্ম নেয়। যেন সত্যি সত্যি একটা ভূখন্ড আবিষ্কৃত হলো। দুঃখ, বইটার হার্ডকপি পাইলাম না। দেখলাম, অনুবাদও নাই। প্রতি বছর কতো গু-গোবর অনুবাদিত হয়ে বাইর হয়। এইসব বই কেউ চোখে দেখে না।