একজন প্রতিবাদী সমাজ সচেতন শিল্পীর প্রস্থান

376

এম এ হাশিম

শঙ্খ ঘোষ ছিলেন সমকালীন বাংলা কবিতার জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। রবীন্দ্র ভাবধারায় অনুগামী হলেও তাঁর কবিতা স্বতন্ত্রের গৌরবে ভাস্বর। বর্ষীয়ান এই কবি ২১ এপ্রিল ২০২১ বুধবার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পরলোক গমন করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য একজন প্রতিবাদী সমাজ সচেতন শিল্পীকে হারালো।

শঙ্খ ঘোষের আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। তার পিতা মনীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং মাতা অমলা ঘোষ। তিনি বাংলাদেশের বর্তমান চাঁদপুরে জেলায় ১৯৩২ খ্রি ৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। বংশানুক্রমিকভাবে পৈত্রিক বাড়ি বাংলাদেশের বরিশাল জেলার বানারিপাড়া গ্রামে। শঙ্খ ঘোষ বড় হয়েছেন পাবনায়। পিতার কর্মস্থল হওয়ায় তিনি বেশ কয়েক বছর পাবনায় অবস্থান করেন এবং সেখানকার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন।

পঞ্চাশের কবিদের মধ্যে শঙ্খ ঘোষ ছিলেন অন্যতম প্রতিভাবান একজন কবি। পঞ্চাশের কবিদের কবিতায় সমাজ সচেতনতা ও স্বদেশ ভাবনা অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিলো।
শঙ্খ ঘোষের কবিতায় তাই সমকালীন সমাজ, রাজনীতি এবং ক্ষমতালোভী শাসকশ্রেণীর নগ্ন চরিত্র দারুনভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। শঙ্খ ঘোষ সম্পর্কে শিশির কুমার দাস বলেছেন,
‘শঙ্খ ঘোষের কাব্যের মধ্যে দুটি ধারা পাশাপাশি প্রবাহিত, একটি আত্মমুখী এর নির্জনতা সন্ধানী ব্যক্তিসত্তার আত্মকথা, সংকেতময় ভাষা,
অনুত্তেজিত কণ্ঠস্বর। অন্যটি চারপাশের অসঙ্গতি, সমাজের বৈষম্য ও অমানবিকতার প্রতিক্রিয়ায় বিচলিত ও ক্রুদ্ধ ব্যক্তি মনের প্রতিবাদের ধারা।’

শঙ্খ ঘোষের প্রথম কাব্য ‘দিনগুলি রাতগুলি’র কবিতা বাস্তবিকই বাংলা প্রতিবাদী কবিতার বিশ্বে এক ঝলক নতুন বাতাস। এ কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় তৎকালীন সময়ের নানা অনুষঙ্গ অত্যন্ত চমৎকারভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে।

কাব্যের ‘যমুনাবতী’ কবিতায় প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যক্তি কবির প্রতিবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কবিতাটি সমসাময়িক দারিদ্র্যকে উপস্থাপন করেছে। সে সময় ঘরে ঘরে খাদ্যের অভাব। কোচবিহারে খাদ্য আন্দোলনের মিছিলে পুলিশের গুলিতে কিশোর হত্যার প্রতিবাদে কবি লিখেছেন_

“নিভন্ত এই চুল্লিতে তবে
একটু আগুন দে।
হাতের শিরায় শিখার মতন
বাঁচার আনন্দে।”

সমাজ সচেতন কবি চারপাশের নগ্নতা, বিকলাঙ্গতা ও সাধারণ মানুষের হাহাকারের চিত্র কবিতায় চিত্রিত করেছেন। সমকালে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটি ছিলো উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে দুর্বল। কারণ জন্মের পরই তাকে বাঁচার জন্য, জীবিকার জন্য লড়াই করতে হয়েছে। কবি এ সম্পর্কে বলেছেন,

“এ কোন দেশ?
মৃত্যু তার স্থালিত অঞ্চল ঢালে দায়িতমুখে
শিশু তার জন্মে পায় দুর্বল দুয়ারে
হাহাকার।” (শিশুসূর্য)

সদ্যস্বাধীন দেশের সরকার জনগণের নূন্যতম চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। দুবেলা দুমুঠো খাবার জোটাতে হয়েছিল অসমর্থ, ফলে হাহাকার, মৃত্যুশোকে কালো হয়েছিল এ দেশের আকাশ। এমন করুন ও দুর্দশার চিত্র কবিমনে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছে। তাই ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে কবি প্রতিবাদী হয়ে বক্রবাচনে প্রকাশ করেছেন তার লেখনি শক্তি।

“এ কোন দেশ?
তোমার শরীর শিশু মৃত্তিকায়
নগ্ন করে করে
শৈশব কামনা করে দেশমাতা দেশ
এ কেন দেশ
অসংখ্য শিবিরে রুদ্ধ শিবির কামনা করে
এ কোন দেশ।”

শঙ্খ ঘোষের কবিতা অজটিল আবেগময়তায় সুলিখিত। দুঃসাহসিকতা ও বয়সোচিত বিদ্রোহের বদলে কবি বাংলা কবিতার নব দিশা নির্মাণ করেছেন। তার কবিতায় যে সমবেদনা, নম্র আন্তরিক স্বগতোক্তি রয়েছে তা তত্ত্বের প্রাত্যহিকতার ছাপে মলিন হয়ে যায় নি। তৎকালীন শাসকের রক্ত চক্ষুর বিপক্ষে সত্য ও ন্যায়ের কথা বলা কঠিন ছিলো। কবি এ সম্পর্কে কবিতায় বলেছেন_

“মনের মধ্যে ভাবনাগুলো ধুলোর মতো ছোটে
যে কথাটা বলব সেটা কাঁপতে থাকে ঠোঁটে
বলা হয়না কিছু
আকাশ যেন নামতে থাকে নিচুর থেকে নিচু
মুখ ঢেকে দেয় মুখ ঢেকে দেয় বলা হয়না কিছু।” (অন্যরাত)

দেশভাগ পরবর্তী সময়ে মানুষের যে আশাহীনতা ও করুন অবস্থায় পতিত হয় তা তিনি কবিতায় চাপা বিক্ষোভে প্রকাশ করেছেন। তৎকালীন শাসকশ্রেণীকে লক্ষ্য করে বাক্যবাণ ছুড়ে দিয়েছিলেন কবি। মূলত ব্যর্থ ও জনকল্যাণ বিমুখ শাসকের জন্যই মানুষের এমন আশাহীনতা। কবির ভাষায়_

“আশা নেই ভাষা নেই,
অন্ধ বর্বর যুগ
যে মারে সেই বাঁচে
অন্তত মা-র মুখে তাকিয়ে এ ছাড়া
আর কোন আশা?
(ঘরে বাইরে)

কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতায় প্রকৃতি চেতনা এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে।
প্রকৃতির বিরূপ আচরণ জনজীবনে যে প্রভাব ফেলেছে তা সুনিপুণভাবে কবি তার কবিতায় প্রতিফলন করেছেন।কবির কাছে প্রকৃতির রুক্ষ আচরণ যেন সমকালীন শাসকগোষ্ঠীর মতই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। কবির ভাষায়_

“দুপুরের রুক্ষ গাছের পাতায়
কমলতাগুলি হারালে
তেমাকে বকব, ভীষণ বকব
আড়ালে।” ( আড়ালে)

দেশের বিরূপ প্রকৃতি কবি মনে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছে। সাধারণ জনজীবনকে ব্যাহত করেছে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতম রূপ। এদেশের মাটির বুকে খরার অভিশাপ নেমে এলে খরা কবলিত এলাকার মানুষের মাঝে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, সেই তীব্রতার ছবি কবির মর্মমূলে দারুণভাবে আঘাত করেছে। তাঁর ‘মূর্খ বড় সামাজিক নয়’ কাব্যের ‘খরা’ কবিতায় অনুষঙ্গটি প্রকাশ করেছেন এভাবে__

“সব নদী নালা পুকুর শুকিয়ে গিয়েছে
জল ভরতে এসেছিল যারা
তারা
পাতাহারা গাছ
সামনে ঝলমল করছে বালি।”

শঙ্খ ঘোষের কবিতার মধ্য দিয়ে কবির অন্তরের বোধ ব্যাপ্তি লাভ করেছে জীবন জিজ্ঞাসায়। ১৯৪০ সালের পর থেকে রুক্ষ প্রকৃতি তথা খরা পীড়িত প্রান্তর বারবার এ দেশের বুকে মৃত্যুর ধ্বংস লীলা সৃষ্টি করে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে কবি কিছু করতে না পারায় মনবেদনায় আশ্লেষ্ট হয়েছেন। কবি বলেছেন __

“আমার জন্য একটুখানি কবর খোঁড়ো
সর্বসহা
লজ্জা লুকাই কাচা মাটির তলে
গোপন রক্ত যা কিছুটুক আছে
আমার শরীরে, তার সবটুকুতে যেন শস্য ফলে।” (কবর)

স্বদেশ প্রতি কবির বরাবরই ছিলো আলাদা ভালোবাসা ও গভীর মমত্ববোধ।তাই দেশে যে কোন দুঃসময় কবি ছিলেন সদা জাগ্রত ও সচেতন। দেশে যখন বন্যার ভয়াবহতা মানুষকে গ্রাস করেছে তখন কবি উদ্বিগ্ন হয়েছেন। কবির হৃদয় মর্মাহত হয়েছে মানুষের কষ্ট দেখে।

“আবার সুখের মাঠ জল ভরা
আবার দুঃখের ধান ভরে যায়
এমন বৃষ্টির দিন মনে পড়ে
আমার জন্মের কোন শেষ নাই।”
(বৃষ্টি)

শঙ্খ ঘোষের কবিতার জগত ছিলো সমাজ,দেশ,মাটি ও মানুষের এক অনবদ্য সংমিশ্রণ। সমকালে তাঁর মত সমাজ ও দেশ প্রেমে আত্মনিয়োগকারী কবি প্রতিভা কমই ছিলো। কবির এই চলে যাওয়া বাংলা সাহিত্য প্রেমীদের ভীষণভাবে ব্যথিত করেছে। কবির সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্ম এবং বাংলা সাহিত্যে অনবদ্য অবদান যুগ যুগ ধরে আমাদের মাঝে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে এই প্রত্যাশা।

এম এ হাশিম
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।