আহমেদ শিপলুর গুচ্ছ কবিতা

380

নিখোঁজ ডাক বাকসো…

হারানো ডাক বাকসের খোঁজে বেওয়ারিশ চিঠি ঘুরছে শহরে। ডাক পিয়নের খাকি স্মৃতি রয়ে গেছে যাদের মনে, তারা মেনে নিয়েছে টুংটাং; হলুদ খামের বদলে ঝকমকে স্ক্রিন। ভীষণ একলা থাকার দিনে কাটা ঘুড়ির সুতো ধরার মতো এইসব আয়োজন। কোথাও সন্ধ্যা নামছে ভেসালের নৈঃশব্দ্যে। পেতে রাখা অপেক্ষায় মাছেরা সমর্পিত হবে। রাত বাড়লে বিলের কিনারায় ঘোলা হতে থাকা দৃশ্যপট।

চিরকাল একটি মুখ চিঠি লেখে…

অশরীরী আঙুলের স্পর্শ টের পাই কুয়াশার কররেখা ধরে হেঁটে যাওয়া পথে। ডাক বাকসো হারানো শহর। চিঠিদের মজমায় শূন্যতার ফিরতি খাম। ভাঁজগুলো রয়ে গেছে পিচঢালা পরতে। হাঁ করা কাটা রাস্তায় উঁকি দেয় ইতিহাস।

আত্মকাণ্ড অথবা হত্যার বিবরণ

আত্মহত্যার আগে কানের ভেতর ঢেলে দেবো শিশা! বাঁশির সুর যদি হারায় পৃথিবী, যদি নিষিদ্ধ হয় বাতাসের গুঞ্জন, সংগীতের লহরি।

মৃত্যুকে ডেকে নেবার আগে চোখদুটো তুলে নেবো ধারালো খোঁচায়! সুন্দর ও মনোরম দৃশ্য যদি হারায় নিঝুম দুপুর, অথবা বিকেলের গাল ঢেকে যায় কালো মেঘে! যদি সন্ধ্যার চোখ, ভ্রু, চিবুক এবং ঠোঁট আর দৃশ্যমান না হয়।

ওরকম পৃথিবীতে জন্মাবার আগেই নিজের হত্যাকাণ্ড ঠিকঠাক রাখবো দাইয়ের টেবিলে! প্রথম নিঃশ্বাসের আগেই যদি জেনেই যাই শব্দকরে হাসা এখানে নিষিদ্ধ! যদি জেনে যাই পাহাড়ের দেহ থেকে মুছে গেছে প্রেম! পেশিবহুল শরীর থেকে নিভে গেছে কামের নদী! যদি বুঝে ফেলি ঝরনার জলে স্নানের নিষিদ্ধতা, কোমল চাহনি ডুবে গেছে অন্তঃপুরে! উষ্ণ স্পর্শ কিংবা ইশারার ঝিলমিল থেকে বঞ্চিত হবে যৌবন! তবে ভুলে যাবো শ্বাসকষ্ট!

নিজের হাত! এবং হাতের আঙুল কেটে নেবো কাটিংপ্লাসে! যদি ঘুম ভেঙে দেখি এই হাত এবং হাতের আঙুল হারিয়েছে সৃষ্টির আনন্দ! পা’দুটো বন্দি হবার আগেই রেখে দেবো উনুনের গহবরে। দগ্ধ হবার আনন্দে ভুলে যাবো শেকল পরার শোক।

মৃত্যুর মাতমে প্লাবিত হবো! যদি দেখি কোনো সুর ছবি কথা অথবা কাব্য নেই আর কোথাও!

টাকিলা রাতের মেঘবিল

টাকিলা রাতের জ্যোৎস্নায় পালক খসা মেঘের জিপার। হাওয়ার টান। সরে সরে যায় আকাশ।
চাঁদ। আপ্রাণ চেষ্টায় রত।
খোলা ময়দান। চরাচর ঝিকমিক। দূরের দিগন্তে ফালি ফালি রাত।
ভীষণ আগলে রাখা দেহ আলগোছে যায় খুলে।
মাঠ মাঠ জ্যোৎস্না। বিলের জলে কাঁপে।

ছত্রিশ তলার সিঁড়ির মতো অকেজো শহর। ছাদ। ব্যালকনি। মৃতদের ছায়া অথবা শয্যা।
এসব ফেলে আসা যায় না।
ফাঁকা রাত। বৃত্তাকার ধুধু। সবুজ পেরিয়ে যেতেই কেবল চোখের শান্তি। নেশাধরা অথবা রাতে পাওয়া ছায়ামানব। ভুলে থাকা যায় ঝলকানি।

পৃথক সত্তাকে ডেকে নেয়া যায় মাতলামির আড্ডায়।
বলে দেয়া যায় তরল গোপন। জিভের আরাম হয় খুব। মেকি জানালায় চোখ রাখা। অহেতুক ব্যর্থতা। বয়ে বেড়ানো নাগরিক নৈরাজ্য। মুক্তি দেয়া যায় ঠোঁট চিবুক ও কণ্ঠকে।

ভেসেযাওয়াস্রোতেরদিকেতাকালেই গতি প্রাপ্ত হয় চাহনি। বিপরীত স্রোতে সাঁতরায় বোকা মাছ। রাত বাড়ে। মছের শরীর ঝলকায় ফাঁদের গা ঘেঁষে। রুপালি অন্ধকারে জলের ঘুঙুর বাজে। আমাদের মাতলামো ফুরাতেই রাস্তা হারাই। মাছের মতো যাত্রা করি ফাঁদের সিগন্যালে।

বেয়নেটসিঙ্গার কাঁপাবে জলের নৌকা

মৃত্যু। ঝুলে আছে ফলকে।
এপিটাফ ঝোলানো গলায়। মানুষ তাকে জীবন বলে।
ভাঙা রোদ। কচলে দেয়া আকাশ থেকে একটা অলৌকিক আঁচল নেমে আসবে কোনোদিন।
স্নেহাস্পর্শর অপেক্ষায় চিবুক। ত্বক থেকে রোল ওঠে কান্নার।

ইউটার্ন চাহনি রেখে যাই রোজ। সিগনালে বাদুড়ের জুয়া খেলা। বাঁশিতে বাজে না মায়া। কেবল হুইসেল হুইসেল জীবন।
একশো ছাপ্পান্ন অমাবস্যা ধারায় বন্দি সোনার যৌবন। আর তুমি কিনা চুয়াল্লিশ ভাঙনের গান শোনাও!

হর্ষক চিৎকার! ক্যালানো গারদের দেয়ালে শ্লোগান। আর্তরাতের অণ্ডকোষে হিসি করে দিলে কোনো বয়ানেই টিকবেনা দণ্ডবিধির শেকল। পকেট ভর্তি নোটবুকে লেখা আছে চুমুর হুশিয়ারি। বেয়নেটসিঙ্গার কাঁপাবে জলের নৌকা।

শরীর ভর্তি রিরি! ঘৃণিত স্পর্শ!
মানুষের কলঙ্ক মেখে স্নানে গেছে ন্যাপকিন

ন্যাপকিনের স্নানযাত্রা

মানুষের মুখ ধুয়ে যাওয়া জল গেছে নদীতে
পবিত্রতার প্রার্থনায় ধাবমান সমুদ্র পানে

বৃষ্টিকে ছুঁয়ে দেয়া জঙ্গল চেয়েছিলো প্রজাপতির ওড়াউড়ি
শ্রেষ্ঠত্বের দাবি তারা মানে না মোটেই

ভালোবাসতে না পারা ধার্মিকের চোখেমুখে কাটা মুন্ডুর বীভৎসতা!
মুন্ডুহীন আরাধনায় কোনো প্রেম ছিল কি না
নরম আলোয় বেড়ে ওঠা ধুতুরার ফণাধর ছোবল জানে না সেসব
চারপাশে আলোখেকো মানুষের কিলবিল
করপোরেশনের ব্যস্ততা কেবল মোলায়েম কুকুর নিধনে!

অনি/সিনেটিভি