শিহাব সরকার এর একগুচ্ছ কবিতা

385

করোনাকালের কবিতা

জীবন জনপদ সব ছারখার, কোথায় পালাবে
কারা যেন অন্ধকারে কবর খুঁড়ছে
অচেনা নদীতীরে শ্মশানের ছাই
চাকা ঘুরছে না, পথে লোক হাঁটছে না
অরণ্য মেতে আছে পাখি ও পতঙ্গের উল্লাসে।

টারমাকে নিস্তেজ বিমান, মাকড়ে জাল বোনে
নিঃশব্দে যারা গেছে, তারা জানে
কীভাবে আসে দৈত্যের ঝাঁক —
কীভাবে মিশে থাকে বাতাসে মৃত্যুকীট
গর্জন করে না হানাদার বাহিনীর মতো

জাতিসভা জনসভা শান্তি-বৈঠক বনধ্‌
সৈকতে ছাতা বনধ্‌ রেস্তোরাঁ বার ক্যাসিনো বনধ্‌
ভালোবাসা বনধ্‌ হানিমুন বনধ্‌
সাধুসন্তের গুহাবাস টিভি চ্যানেলে,
মনে করো ভুলে-যাওয়া নববর্ষের নৃত্যগীত।
‘যেয়ো নাকো কভু আর বাহিরে, ঘরেতে থাকো’
করোনার সাঁড়াশিতে পৃথিবীর টুঁটি।
উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু, সব দরজায় খিল
হাসপাতালে মৃত্যুযাতনা, আর কান্না

কতকাল বলো আর বদ্ধঘরের কারাগারে
লেগেছিলো সেই কবে মনের ভিতর মহামারী,
মনের জঙ্গলে রক্তাক্ত দাঙ্গা
ঐ ভুবনে অনন্ত করোনা, থামে না মহামারী।

আমার চোখ দিয়ে দ্যাখো, মা মণি

(সদ্যপ্রয়াত কন্যা পূর্বার স্মৃতি)
তোমার ছিলো দেখার তৃষ্ণা, ছিলে মনভবঘুরে
আমারও ছিলো অন্তহীন পিপাসা
যেখানেই গিয়েছো তুমি
ক্যাম্পাসে ঝিলের পাড়ে, নিঝুম সাজেকের
বনপথে, হাঁটতে হাঁটতে সৈকতের ধূসরে
আবার বটতলায় বন্ধুদের আড্ডায় —
দেখেছো ছবির ভিতরের কত ছবি

তোমার প্রিয় গানগুলি বেজে যায় আমার ভিতর-জলসায়
শুধু আমি শুনি, আর কেউ না

কী দ্যাখো মা মণি, কী শেনো এখন
কোথাও কেউ নেই, অবয়ব নেই, ছায়া নেই
ভিন্ন দৃশ্যাবলী, শব্দলহরী — অপার্থিব, ভূলোকের অতীত?
নাকি ধু-ধু সাদা শূন্যতা
টিভি খুললাম বহুদিন পর, ধূলিঢাকা পর্দায়
ভাসছে তোমার সা-রে-গা-মা-পা, পুরনো মুভি
’শোকের বাড়িতে কে দেখে টিভি, এ কী অনাচার’, গুঞ্জন ওঠে

আমি দেখতেই থাকি টিভি মা মণি আমার,
তোমার জন্য দেখি, আমার চোখ দিয়ে দ্যাখো
তুমি তোমার প্রিয় ছেড়ে-আসা মায়াপৃথিবী।

শিরোনামহীন
।১।
তুমি উড়ে গেছো কবে
মেঘে কি ময়ূরে,
আমি আছি আজও সেই
মন-ভবঘুরে।

।২।
ধানে-দূর্বায় সাজিয়ে তোকে
গড়ছি অহর্নিশ
বুকে তবু উঠলো ফুঁসে
শিল্পনাশী বিষ।

সে ছিলো এক একুশের ভোর

সেই ভোরে শহরে ছিলো ফাল্গুনের কুসুম-শীত
শিশিরের কণা ছিলো ঘাসে, পলাশ ফুটেছে
আমরা ক’জনা ভেজা ঘাস মাড়িয়ে
ফুলে ঢাকা শহীদ মিনার থেকে বাংলা একাডেমিতে
কালো ব্যাজে, নগ্ন পায়ে। হাতে হাতে একুশের পুস্তিকা
স্বাধীন বাংলায় প্রথম একুশের ভোর

বটতলা মঞ্চে কবিতাপাঠ শেষে কোরাসে গান হচ্ছে
আছেন কবিরা পাশাপাশি বসা —
শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, তরুণেরা
সে ছিলো একুশের ভোর স্বাধীন বাংলােেদশে
শিশিরের কণা ছিলো ঘাসে, পলাশ ফুটেছে
তারপর আরেক কবিতার সূচনা …

ভেজা ঘাসে বিছানো চাটাইয়ে চিত্ত সাহার বইয়ের পসরা
এ-ও হয় নাকি, এরকমভাবে বইয়ের বিকিকিনি ?
বুঝিনি সেদিন এভাবেই উঠে যায় কীর্তিস্তম্ভ
শুরু হয় কোনো কোনো অমর কবিতা,
গঙ্গোত্রী-গোমুখ থেকে যেভাবে
নেমে এসেছিলো গঙ্গা-পদ্মা-গড়াইয়ের ধারা,
জানি না কার দিব্যচোখে ছিলো এই নদীজন্ম
প্রভাতফেরি করে আসা আমরা ক’জনাও
পড়তে পারিনি চিত্তদা’র দূরাভাসী চোখ

চাটাই বিছিয়ে বই বেচছেন চিত্ত সাহা
একুশের দিনভর: কী অবাক দুরূহ সেই গদ্যছবি
এখন বইয়ের উৎসবে বইগুলো সব স্বপ্নের প্রজাপতি
মেলামাঠ জুড়ে পদ্যছবি, অবিনশ্বর আনন্দ-কবিতা

লিখেছিলেন চিত্তদা প্রথম পঙ্ক্তি সেই ভোরে।
ম্রিয়মান শিহাব সরকারের কিছু কবিতা
নিষ্প্রদীপের শুরুতে—

দ্যাখো এই অন্ধকার—কেবলই গাঢ় হয়ে আসে
চেপে থাকে বুকে, চেপে থাকতে থাকতে
ঢুকে যেতেছে মগজে ও মনে, ছোঁড়াখোঁড়া খোয়াবে
হৃৎপিণ্ডরা সব কাদা, মাথা-মগজ শিলামাটি।

গহিন অন্ধকারে এ কোন অরণ্য আদিম
গুহামানবের আগুন নিভুনিভু দমকা কু-বাতাসে,
হরিণেরা ছুটছে দিক্‌-বিদিক
দেয়ালে বাইসন আঁকা, ধূলিতে ফসিলের হিম

কুহেলি কেটে গেছে—ঘোর ভেঙেছে
আমারও ভোর, চোখ রগড়ে বসেছি জানালায়।
এত মাকড়সাজাল বাদুড়ের বিষ্ঠা, মরাপাতা
মেঝেতে মড়ার খুলি, হকিংয়ের ল্যাপটপে ভুডুনাচ।

নিষ্প্রদীপের শুরুতে তক্ষক ডেকে যায় নিঝুমে
সকালবেলা মধ্যরাত্রির নৈঃশব্দ্যের ধুন
সব বাতিঘর আর চূড়া, স্মৃতিস্তম্ভ—ধসে গেল, হায়
এ কেমন ঘোর কালো, দু-একটা শিখা শুধু কাঁপে

আরও অদ্ভুত, আরও গভীর অচেনা আঁধার এক।

হেমন্তের ছায়ামায়া
ট্রেন আসে না, ঐ যে ঝকঝকে বাস
এইখানে মাকড়সাজাল স্মৃতিরা ধূলি
বসে থেকে থেকে বেলা, কার্নিশে কাক
নেমেছি বিকেলের আলপথে।
প্ল্যাটফর্মে গাঁজা ও ভবঘুরে, কুকুর-কুণ্ডলী
ইটখোলার চিমনি সারি সারি আকাশে
দূরশহরে ধূসর রেল রংঝলমল
হুইসিল নেই, হাওয়াবেগে গাড়ি ছোটে
কবে ঘোর লেগেছিল, দূর্বাদলে শিশিরকণা
ধানকাটা মাঠ থেকে গূঢ়-গোপন ইশারা
মনগহনে নবান্নের ধুম লেগেছে
জানি এইসব কেবলই ছায়ামায়া,
মাঠে খানাখন্দে গোপাটে বেওয়ারিশ লাশ
মাথার ভেতরে কত নাড়াখড় পোড়ে।
অচেনা মাঠ থেকে ফিরে আসি
বাতিল প্ল্যাটফর্ম। অলৌকিক ট্রেন ছুটেছে
চকিতে সেই হারানো মুখ, চুল খোলা

শুকানো ক্ষত থেকে রক্তপুঁজ নামে।

সুড়ঙ্গ-কথা

পিঁপড়ের বাসায় হিম, হিম অন্ধকার
ঐ সুড়ঙ্গে ঢুকে গিয়েছিলাম আমি আজ
পিঁপড়েরা আমায় কাটেনি তো,
পিপীলিকা কেউটের মতো নাকি
যদি না তুমি উহাদের …

রাণীপিঁপড়ের মহলে জোড়হাতে:
‘রাণী মা, আমি তুচ্ছ মানুষ, আমারই ভুল,
ঢুকে গিয়েছি গহীনের প্রাসাদে,
পিঁপড়েরা খুনে নেই, খুন করে মানুষ
মেরেছে পায়ে পিষে কোটি পিপীলিকা…’

রাণী মা হাসেন রহস্য-হাসি।

আমার ধমনীতে পৃথিবীর শেষ নদী
শরীরভর্তি লাল পিঁপড়ে, বিষপিঁপড়ে
আবারও পায়ে দ’লে পিষে পিঁপড়ের দল
সুড়ঙ্গ থেকে উঠে আসি আছাড়িপিছাড়ি।

চেনা শহরে ঈগলু কলোনি, স্লেজগাড়ি –
আইসক্রিম পার্লারে গিয়ে ঢুকি। ভুল
উৎসবে মমিরা ঝিমায় দিনভর রাতভর
টেবিলে গলে পড়ে আইসক্রিম
অন্ধকারে মমি দম্পতি বলনাচ করে।

টিভিতে আমাজন জঙ্গলে আদিবাসী

পল্লীতে পাতালরেলের সুড়ঙ্গ নেমেছে।

ইনসমনিয়া

ঘুম ভাঙে শেষরাতে প্রতিদিন
ভোরগুলো ছাইঘুম-মাখা, রাত্রির
উচ্ছিষ্ট চাটি। ক্লান্ত লাল চোখে
অনিদ্রার তর্জনীতলে ঝিমাই দিনভর।

ভুলগুলো ভূত, শেষরাতে তেনারা আসেন
তখন পিপাসা তীব্র, খরার মধ্যে মাহে ভাদর
বহুদূরে মেঘনা গর্জায়, বাহ নদী
মনে আছে দামাল বালকের সাঁতার!

ভুলগুলো পিছু ছাড়ে না
চিলেকোঠায় মানুষ মরে থাকে, কেউ কেউ থাকে
শূন্যে ভেসে। বাতাসে কার অট্টহাসি,
গাছের পাতায় পাতায় ভুলের ফর্দ

পাতা নড়ে পাতা ঝরে, ইনসমনিয়া
থাবা মেলে। দৈত্যের লালা ঝরে।


মাথার ভিতর

মাথাভর্তি মুকুল নিয়ে ঘুুরি
মাথার ভিতর আকাশ কত নীল
আবহমান বাজছে একটি সুরই
ছায়ানারীরা বাতাসে খিলখিল।

স্বপ্নে নদী কেবলই সরে যায়
গাছের ডালে ঝুলছে থোকা ফল,
অচিনপুরে বন্দীরা গান গায়
ভোর থেকেই দিক ভোলাবার ছল।

দেখতে দেখতে হয়ে গেছি মাছি
পাকা ফলের গন্ধে উড়ে যাই,
সকাল-সন্ধ্যা সৌরভে বুঁদ আছি

মাথার ভিতর তুফান কী সাঁই সাঁই।

‘চলে এসো মঞ্চের পেছনে’ কবিতাটির অংশ

‘তুমি যেখানেই থাকো নমিতা
এলোমেলো সাজঘরে প্যান্ডেলের মাঝখানে লোলুপ জটলায়
এক্ষুণি চলে এসো মঞ্চের পেছনে
তোমার জন্য পৃথিবীর সমস্ত ঘড়ি
এগারোটা ঊনষাট মিনিটে স্থির হয়ে আছে
তোমার জন্য আমরা আজ ঘুমুতে পারছি না

গাছ ও পাখিদের আরো একদিন আয়ু কমে গেলো
বুড়ো হয়ে এলো বামন
খঞ্জ বদমাশ, তুচ্ছ ও মহামানবেরা
পৃথিবী ও তারাপুঞ্জের বলয়ে বৃত্তাকার ঘুরে ঘুরে
লক্ষ কোটি আলোকবর্ষের একটি মুহূর্তে
আরো কিছুটা ম্লান হয়ে এলো চাঁদ

তুমি কেন এই ভৌতিক মুখোশের নাচে
নৃত্যপটীয়সী অমোঘ নায়িকার ভূমিকায় ডুবে আছো
এইসব বিচলিত যৌনকাতর যুবকেরা
ভোরবেলা তোমার ছিন্নভিন্ন শরীরের ছাই, ঘৃণা ও বমন থেকে
তুলে আনবে বিনাশী পদ্মের প্রতীক,
আমাদের শৈশবের বুক ফেটে যাচ্ছে
তোমার মা ও মাতামহীদের অভিশপ্ত জারজ ফুলের ঘ্রাণে

আমরা তোমাকে মধুর মৃত্যুর মতো চাই সাধারণ বাঙালী নারী
তোমার জন্য নমিতা, শুধু তোমার জন্য

পৃথিবীর সমস্ত ঘড়ি…

‘লালযৌবনদিন’ থেকে

‘নদীর ধারে যেতে যেতে মনে হয় যাচ্ছি জলভ্রমণে
বহতা স্রোতের প্রতি তোমার কী অদ্ভুত গাঢ় টান,
নদী একদিন পাহাড় তছনছ করে ছুটে এসেছে
আমাদের লোকালয়ে
তার দু’ধারে সমাহিত নিগুঢ় জনপদ।
দেখে আমরা চিত্তে খুব সুখ পাই

মানুষের পদ্মা ভোলগা দানিয়ুব ইত্যাদি প্রচুর
টলটলে উদ্দাম নদী আছে
জল আমাদের পূর্বপুরুষের ধমনীতে
কামনার ঝড় তুলেছিলো
একসঙ্গে অনেক জল দেখে উদাস হয়ে পড়ি
বুকের ভিতরে এমন করে!’
(চাঁদের আশ্চর্য ভূত)

‘মধ্যদুপুরে এইসব মিশ্র তৎপরতা দেখে
আমার পায়ের ডিম শক্ত হয় ক্রমশ
উদ্ধত হয়ে ওঠে শিরদাঁড়া
চিৎকার করে বলি, আমার কোনো স্মৃতি নেই দাহ নেই
আমি শুধু বাঁচবো।
বন্ধু পরমাত্মীয় থেকে রক্ত বৈরী
যেখানে যাই খুব ভালোবাসা-টানমমতা-টান
তারপর সন্ধ্যা হয়, রাত যত বাড়ে
আকাশ কেবলি উঁচুতে উঠতে থাকে’
(রাত যত বাড়ে)

‘মোমবাতি জ্বেলে তুমি বসে আছো, আমাকে
গতরাতের উল্টানো ইজেল, তছনছ দোপাটি বাগান
দেখাবে বলে আলো উঁচু করে ধরেছিলে
চেতনা চৌচির করে কেন
এইসব অশ্লীলতা, রক্ত, জালিয়াতি…

তার চেয়ে ওষ্ঠে বিষ ছোঁয়ালে না কেন?

(অন্ধকারে হরিৎ প্লাবনে)

এইসব বাড়ি

‘হাইরাইজ উঠে গেলো, কোথায় মাটি, গাছতলা
আমাদের গলির মুখে ট্রাক থেকে
নামে ইট কাঠ লোহা বালু
উঠছে ছ’তলা শপিং কমপ্লেক্স
হলুদ বাড়িটা ভাঙা হয়ে গেছে
নন্দী কুটিরের নাম মুছে যাবে পাড়ায়,
কোন সালে উঠেছিলো এ বাড়ি
জানা যেতো বরুণ নন্দীর কাছে
তাঁর ছেলেরা আছে কলকাতা, শিলিগুড়ি

শ্যাওলা-ভেজা প্রাচীন ইটের স্তূপ সুরকি।
বাড়ি ভাঙা হয়ে গেছে
ফটকে বকুল গাছ লাল ধুলোতে ছাওয়া
দীর্ঘশ্বাস চাপে তরুণ স্থপতি-
দালান না ভেঙ্গেও দালান তোলা যায়
শতাব্দীর ধ্বনি লেগে ছিলো বাড়িটার গায়ে

কোনো বাড়ি…

অনি/সিনেটিভি