বামনদের করুণকাব্য ‘ছোটদের ছবি’

218

এই সুন্দর পৃথিবীতে লিঙ্গভেদে ৯৯% মানুষ স্বাভাবিক জীবন পেয়েও হাজারো দুঃখে মন ভারাক্রান্ত করে রাখে! কালো হলে ফর্সা হওয়ার আর্তনাদ, মোটা হলে স্লিম হওয়ার আকুল আকাঙ্খা কিংবা শুকনো হলে সুন্দর স্বাস্থ্যবান হওয়ার অদম্য প্রচেষ্টা আমাদের রাতের ঘুম হারাম করে দেয়!

কিন্তু যারা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী কিংবা আকৃতিতে ছোট তাদের জীবনের আকাঙ্ক্ষাগুলো কেমন সেটা কি কখনো অনুধাবন করতে পেরেছি? না… সেই বিষয় অনুধাবন করার কোন আগ্রহই আমাদের নেই! কারণ তারা কি মানুষের শ্রেণিতে পড়ে?
তারা তো এই গ্রহের এলিয়েন! তাদের স্রষ্টা তৈরি করেছেন আমাদেরকে আনন্দিত করার জন্য!

তাইতো নামে মানুষ হলেও ‘সার্কাসের জোকার’ হয়ে আরেক শ্রেণির উঁচু মানুষকে প্রতিনিয়ত বিনোদিত করতে হয় তাদের!
তাদের সমগ্র জীবন এমনকি মৃত্যুটাও যেনো এক একটা হাস্যরসের খোরাক! অভ্যন্তরীণ দহনে ক্ষত বিক্ষত এই সত্তাগুলো বাহিরের জীবনে আরেক অদ্ভুত প্রাণীর বিচরণ হিসেবে আখ্যায়িত! স্বাভাবিক মানুষের শত হাস্যরস কিংবা নানা কটুক্তি আর তাচ্ছিল্যের সুরই জানান দেয় তাদের জীবন হল একটি অলিখিত অভিশপ্ত নরক! যেখানে কথার আঘাতে পুড়ে যাবে রক্তমাংস, অশ্রুসিক্ত হবে দু’নয়ন!

‘ছোটদের ছবি’ সিনেমাটিতে তেমনি কিছু ছোট আকৃতির মানুষদের দৈনন্দিন জীবনের নিদারুন কষ্টের প্রতিটি মুহূর্তকে নিঁখুতভাবে সেলুলয়েডের ফিতায় বন্ধি করেছেন পরিচালক ‘কৌশিক গাঙ্গুলি’!

সিনেমার গল্পে দেখা যায় ‘খোকা’ আর ‘শিবু’ একই সার্কাস দলের জোকার হিসেবে কর্মরত! ঘটনাক্রমে সার্কাসের এক পারফর্ম করতে গিয়ে ‘শিবু’ মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয়! একদম পক্ষাগ্রস্ত হয়ে পড়েন! কিন্তু সার্কাস দল তার মুমূর্ষু অবস্থায় সেভাবে পাশে দাঁড়ায়নি! নিজের ট্রিটমেন্ট করতে ধারদেনা বেড়ে যায়! এমতাবস্থায় হত দরিদ্র ‘শিবু’র সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে! একপ্রকার বাধ্য হয়ে তার মেয়ে ‘সোমা’ ট্রেনে ট্রেনে আরশোলা-ইঁদুর দমনের ঔষধ বিক্রি করে!যখনই এই কথা তার কানে আসে সে অপমানিত হয় এবং আত্নহত্যা করে! ঠিক এই পরিস্থিতিতে শিবুর জীর্ণ সংসারে একজন আলোর দিশারী হয়ে আসে খোকা’! চরম দুর্দিনে সাপোর্ট দেয় শিবু’র পরিবারকে। এভাবেই ঘটনাক্রমে দীর্ঘ সময় একসাথে অতিবাহিত করতে গিয়ে সোমা’র প্রতি খোকার পবিত্র ভালবাসা উঁকি দেয়! কিন্তু দুই বিপরীত লিঙ্গের বামনের এই ভালবাসা কি পূর্ণতা পাবে? এই প্রশ্নের উত্তর সিনেমাটির শেষে পাওয়া যাবে!

সিনেমাটির দুর্দান্ত গল্প আর অসাধারণ ক্লাইমেক্স হৃদয় ছোঁয়ে যায়! বামন মানুষদের বাস্তব জীবনটাই চোখের সামনে প্রতিফলিত হয়ে উঠে!

তাচ্ছিল্য আর শত অপমানে জর্জরিত তাদের জীবন গল্প দেখতে গিয়ে মনের অজান্তেই চোখের কোণে শুভ্র জলের আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠে! অনুধাবন করায় স্বাভাবিক জীবন পেয়েও আমরা স্রষ্টার নিকট কতোটা অকৃতজ্ঞ ভাবাপন্ন!

সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী! বেশ কিছু সংলাপ হৃদয়কে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে! গল্পের কোন একটি বাঁকে ‘সোমা’ তার মাকে প্রশ্ন করে—
সোমা : আচ্ছা মা… লম্বা মানুষের গর্ভে যদি বামন মানুষ জন্মে তবে বামনের গর্ভে কি লম্বা মানুষ জন্মাতে পারে না?

মা : বাবা-মা দুইজনই যদি বামন হয় তার সন্তান আবার কেমন হবে? বামনই হবে!

সোমা : তাহলে তোমরা আমাকে না আনলেই পারতে!

আরেকটি দৃশ্যে খোকাকে উদ্দেশ্য করে সোমার সংলাপ-

“বামনের জীবনে কোন বিয়ে নেই! প্রতিটি বামন একা একা থেকেই এই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক! আর কোন নতুন বামনের সৃষ্টি না হোক!”

সংলাপগুলো অতি সহজেই দেশ, সমাজ আর জাতির বিবেকে কঠিন সব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে যায়!

”রাস্তায় বামন দেখার পর আপনি অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাননি কিংবা মুখে কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্যের হাসি আসেনি”- এর ব্যতিক্রম কি কখনো হয়েছে? একবার নিজেকে প্রশ্ন করে দেখনুন তো?

যদি ব্যতিক্রম হয়ে থাকে তবেই আপনি শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছেন! অন্যথায় অতল তলে নিমজ্জিত হয়ে গেছে আপনার মনন, বিবেক সেখানে মৃত!

পরিশেষে বলতে চাই
”গাহী সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,
নহে কিছু মহীয়ান”

এই সুন্দর পঙক্তির মতোই সুন্দর হোক আমাদের মনন! মানুষ হিসেবে আমরা স্রষ্টার প্রতিটি সৃষ্টিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখবো এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা! প্রতিটি সৃষ্টিই মানব প্রেমের শিহরণ নিয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিবে এটিই হোক সবার চেতনা!

অনি/সিনেটিভি