ভগ্ন দেশ আর রক্তাক্ত হৃদয়

227

পিয়াস মজিদ

১৯৪৭-এর দুঃখ ও লজ্জাজনক দেশভাগের ৭০ বছর পূর্তির বছর ২০১৭-তে স্বনামখ্যাত চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল নির্মাণ করেন প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘সীমান্তরেখা’। কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান মিলনায়তনে বসে যখন এটি দেখছিলাম তখন আমার মানসপটে শওকত ওসমানের ছবিও ভেসে আসছিল খুব কারণ কৈশোরে শওকত ওসমানের ফেলে আসা বসতবাড়ি হুগলীর সবলসিংহপুর-যাত্রার বিষাদগাথা ‘স্বজন স্বগ্রাম’ পড়েছিলাম। নিশুতিরাতে অচেনা গ্রামে ঠিকঠাক পৌঁছে যাওয়ার বৃত্তান্ত পড়ে বোধ জন্মেছিল-আত্মভূমি আসলে স্বতোৎসারিত আলোর ভূমি। বাড়তি বাতিদানের তো প্রয়োজন হয়না এজন্য। সেই আত্মভূমি থেকে বাধ্যগত উৎখাত বা স্বেচ্ছাগত স্থানান্তরের গল্প ‘সীমান্তরেখা’।

বলা হয়েছে ‘প্রামাণ্য চলচ্চিত্র’, আমি তো মনে করে মর্ম ও মহিমায় এটা চলচ্চিত্রেরই কারণ বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তের দুই অংশের বিভাগজনিত ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টেশন, ঐতিহাসিক বিবরণ এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলাপন ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠেছে এর অন্তর্গত আকুল ক্রন্দনের আভা, ফোঁপানো বকুলের বিভা। “সীমান্তরেখা’ ভৌগোলিক সীমারেখার অধিক হৃদয়রেখার অমোচ্য দাগচিহ্ন ধারণ করে আছে।

কোনো প্রাামাণ্য চলচ্চিত্রে একই সঙ্গে বাংলাদেশের খুলনা বা ভারতের মরিচঝাঁপি, দণ্ডকারণ্যের দেখা পাওয়া ভার। উদ্বাস্তু এলাকার নাম হিসেবে ইতিহাসে পড়া জায়গা যখন ব্যক্তিগত বেদনাগাথার অকুস্থল হয়ে দৃশ্যায়িত হয় চোখের সামনে-তখন তা অজানিতেই দর্শকের কণ্ঠ দিয়ে আবৃত্তি করায় ‘এ আমার পাপ, এ তোমার পাপ।’

বছর সত্তর আগে ভাগজনিত বাস্তবে যে পরিবার সীমান্তের অপর অংশে পাড়ি জমিয়েছে সেই পরিবারের কোনো সদস্যের শেকড়-সন্ধানের ক্যামেরা ও কথাসঙ্গী হন যখন তানভীর মোকাম্মেল; তখন সংল্শিষ্ট সে ভূমির প্রতিটি বাড়িঘর, উঠোন, পুকুরঘাট যেন চরিত্র হয়ে ওঠে, যেন দেশভাগের বিরুদ্ধে কথা কয় সমস্বরে, বলে ‘ফিরিয়ে দাও অমল ধবল অতীতের আঘ্রাণ।’ তানভীর মোকাম্মেল, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকারের সাভারের ভাদালিয়ায় তার যমজ বোন লীলা সরকারের সঙ্গে কয়েক যুগ পর সাক্ষাতের ঘটনাটি ‘সীমান্তরেখা’য় তুলে এনেছেন। দেশভাগের করুণতায় ভাই চলে কলকাতায়, বিয়েথা করে বোন রয়ে যায় সাভারে। দীর্ঘদিন তাদের মধ্যে দেখাশোনা ছিলনা। অতঃপর কয়েক বছর আগে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ভাইবোনের যে ঐতিহাসিক সাক্ষাৎপর্ব অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে আমিও ছিলাম এক সহযাত্রী-দর্শক।

‘সীমান্তরেখা’ ঘটনাটির অন্তভুর্ক্তিকরণ আমাকে আপ্লুত করেছে কারণ নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস-অসম্ভব বিভাজন কতটা ক্ষত সৃষ্টি করে গেছে ব্যক্তির হৃদয়ের তলদেশে!
‘সীমান্তরেখা’ দেখতে দেখতে আমাদের যে কারও পত্রিকার পাতায় প্রায়শ পড়া দুই জার্মানি বা দুই কোরিয়ার সীমান্তের গল্প মনে আসবে, যেখানে সীমান্তহত্যা এবং সীমান্তে বার্ষিক পুনর্মিলন-দুই-ই সত্য আর ‘সীমান্তরেখা’ অবশ্যই এই বোধে জারিত করবে আমাদের- ধর্মের রেখা টেনে আপন ভূমি থেকে মানুষকে কাঁটাতারের জীবন গছিয়ে দেয়ার নাম ‘দেশভাগ’ না, বড় রকম অধর্মও বটে!

অনি/সিনটিভি