চার দশকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় : প্রত্যাশা প্রাপ্তির মিলন কতদূর

1087

অনি আতিকুর রহমান

শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির বহু মনীষীর স্মৃতি বিজড়িত ভূমি কুষ্টিয়া। লালন, রবীন্দ্রনাথ, মীর মশাররফ, কাঙাল হরিনাথ কিংবা আব্দুল জব্বার, প্যারী সুন্দরী আর রোকনুজ্জামান দাদাভাই। এমন অনেক প্রবাদপ্রতিম মানবের স্মৃতিধন্য শহর কুষ্টিয়া। দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত এই জেলাতেই ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা পায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ জেলার মধ্যবর্তী নিভৃত দুটি গ্রাম শান্তিডাঙা-দুলালপুরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শ্রেষ্ঠ এই বিদ্যাপিঠের। স্বাধীন বাংলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়টি এ বছর তার জন্মের চার দশক পেরোলো।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান ফটক। ছবি : আব্দুল্লাহ আল বাকী

সবুজে ঘেরা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। দেশের গণমানুষের চাহিদা পূরণে তৎকালীন সরকার ১৯৭৬ সালে ১লা ডিসেম্বর ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। পরে ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে উচ্চশিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ১৯৮০ সালের ২৭ ডিসেম্বর ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৮০ (৩৭)’ পাস হয়। বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বর্তমানে ১৭৫ একর ভূমির ওপর ৮টি অনুষদ, ৩৪টি বিভাগ, ১টি ইনস্টিটিউট, ১টি ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থী এবং সাড়ে চার’শ শিক্ষক নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ এই বিশ্ববিদ্যালয়টি।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাশন ভবন। ছবি : নাছির উদ্দীন আবির

দেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ‘ধর্মতত্ব’ অনুষদের অধীনে ডিগ্রী প্রদান ছাড়াও নৈসর্গিক সুন্দর ক্যাম্পাসের জন্য স্বতন্ত্র পরিচিতি রয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের। কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়কের কোলঘেষে গড়ে তোলা ক্যাম্পাসের দৃষ্টিনন্দন প্রধান ফটক হয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে বঙ্গবন্ধুর সুবিশাল ম্যুরাল ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব’। সেখানে দাঁড়িয়ে ডানে তাকালেই মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘মুক্ত বাংলা’ আর বাঁয়ে সততার স্মারক ‘সততা ফোয়ারা’। পাশেই ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার আর স্বাধীনতাযুদ্ধ সহ অন্যান্য শহীদের স্মরণে নির্মিত ‘স্মৃতিসৌধ’।

এইতো গেল কৃত্রিম সৌন্দর্যের কথা। ম্যুরাল পেরিয়ে একটু পা বাড়াতেই বিস্তৃত সবুজে ঘেরা ‘ডায়না চত্বর’। ‘ক্যাম্পাসের প্রাণ’ এই চত্বরটি শিক্ষার্থীদের আড্ডায় মুখরিত থাকে দিন-রাত। ডায়না থেকে বাঁ দিকে শিক্ষার্থীদের আসাসিক হল, আর ডানে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ডরমিটরি। এ দু’য়ের মাঝেই একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভববসমূহ। ক্যাম্পাসের পশ্চিম কিনারে ছাত্রীদের হল ঘেঁষে বয়ে গেছে মনোরম ‘লেক’। দিনের ভাগে শিক্ষার্থীদের পদচারনায় মুখর একাডেমিক এলাকা; আর বিকেল থেকে সন্ধ্যার কোলাহল লেক পাড়ে। ক্যাম্পাসের নিত্যদিনের এমন প্রাণচঞ্চল দৃশ্যগুলো যে কারো মন কাড়তে বাধ্য।

ইবি’র শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ ও সততা ফোয়ারা। ছবি : নাছির উদ্দীন আবির

হাঁটি হাঁটি পা পা করে চার দশক পার করেছে শতভাগ আবাসিকতার মহাপরিকল্পনা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেব কষতে গেলে- প্রত্যাশার পাওনা এখনো ঢের বাকি। অধরায় রয়ে গেছে বহু স্বপ্ন। লম্বা এ সময়ে বহু জল গড়িয়েছে পদ্মা মেঘনা যমুনার। কালের বিবর্তনে একসময়ের সেশনজটের যাতাকলে পিষ্ট বিভাগগুলোতে কিছুটা গতিশীলতা এসেছে। ক্যাম্পাসে শুরু হয়েছে সংস্কৃতির ঝিরিঝিরি হাওয়া। বাঙালি জাতির রক্তাক্ত ইতিহাসের সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা হিসেবে গ্রন্থাগারে চালু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, একুশ ও বঙ্গবন্ধু কর্ণার। বেড়েছে অবকাঠামো উন্নয়ন। ৫৩৭কোটি টাকার মেগাপ্রকল্পে ৯টি ১০তলা ভবনসহ ও ১৯টি ভবনের ঊর্ধমুখী সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়েছে। যা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে লালিত স্বপ্নের অনেকটাই পূর্ণতা পাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এ দিনটি প্রতিবার নানান উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালন করেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীরাও মেতে উঠে সে আনন্দে। ক্যাম্পাসের ভবনে ভবনে রঙবেরঙের বাতির ঝিলিমিলি আলো আর রাস্তার দু’ধারে রঙিন কেতনের পত পত শব্দে আনন্দের ধারা যেন বেড়ে উঠে বহুগুণ। তবে বিশ্বব্যাপি কোভিড মহামারীর কারণে এবার সেই আনুষ্ঠিকতা অনেকটাই নিষ্প্রভ, ক্যাম্পাসে নেই শিক্ষার্থী। তবু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থেমে নেই সেই আনন্দ-উল্লাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো সম্বলিত বিভিন্ন রঙের ফ্রেমে নিজেদের প্রফাইল ছবি আবদ্ধ করছেন নবীন-প্রাক্তণরা। স্মৃতিচারণ করে অনেকেই প্রকাশ করছেন অনুভূতি, লিখছেন স্ট্যাটাস।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত ‘মুক্ত বাংলা’। ছবি : সংগৃহীত

বিশেষ এই দিনে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে মনে করিয়ে দিতে চাই, আমাদের কিছু প্রত্যাশার কথা। প্রত্যাশার সে হিসেব কষতে গিয়ে- এ মধুরলগ্নে দাঁড়িয়ে পাচ্ছি প্রাপ্তির সুখ; সাথে রয়েছে না পাওয়ার বেদনাও। প্রিয় ক্যাম্পাসে চার বছর পার করে জড়ো করেছি অনেক স্মৃতি। সে আলোকেই বলছি কিছু প্রত্যাশার কথা।

উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যা যা অনুপস্থিত তার সবই প্রত্যাশা করি। এক্ষেত্রে প্রথমেই যেটা দরকার তাহলো ‘ইউনিভার্সিটি বা বিশ্ববিদ্যালয়’ কনসেপ্টটি আমাদের ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে সত্যিকারর্থে স্পষ্ট করে তোলা। অবকাঠামো উন্নয়ন ও মেধার ভিত্তিতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ করে বিদ্যমান একাডেমিক ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করা জরুরি। একাডেমিক গতিশীলতা বৃদ্ধি করতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসিকতা ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ছাত্র-শিক্ষক দূরত্ব কমিয়ে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও তাঁদের মিথস্ক্রিয়া নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এই প্রক্রিয়ায় গবেষণা ক্ষেত্রে জুনিয়র স্কলার হিসেবে শিক্ষকদের সাথে থেকে শিক্ষার্থীদের কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সার্থকতা কিছুটা হলেও পূর্ণ হবে।

শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণ সৃষ্টির পাশাপাশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার। ভবিষ্যতের দক্ষ নেতৃত্ব তৈরী এবং নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং-বুলিং কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করে ক্যাম্পাসে অযাচিত বহিরাগত প্রবেশেও বিধিনিষেধ আরোপ করা উচিৎ। জগদ্দল পাথরের মত শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দেয়া সকল প্রকার বর্ধিত ফি কমিয়ে আনা দরকার। ক্যাম্পাসের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রশস্ততা বৃদ্ধি এবং নারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসের অনুষদ ভবন। ছবি : নাছির উদ্দীন আবির

আমরা প্রত্যাশা করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গুণগত শিক্ষা ও মৌলিক গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রধিকার দিবেন। শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারিদের ফলপ্রসু কর্মশালার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযোগী করে গড়ে তুলবেন। দলীয় সংকীর্ণতার বাইরে বেরিয়ে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ ও যোগ্য ব্যক্তিদের পদায়ন করবেন। বিভাগগুলো থেকে প্রকাশিত জার্নাল নিয়মিতকরণ, মৌলিক আর্টিকেল প্রকাশ এবং সেখানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবেন। সর্বোপরি, একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জ্ঞানের দিক থেকে নেতৃত্বদানকারী একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের উপহার দিয়ে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির আশু মিলন ঘটাবেন।

গোধূলি বেলায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় লেক। ছবি : নাছির উদ্দীন আবির

প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এই আনন্দময় লগ্নে সাবেক বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারি সহ সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। শুভ প্রতিষ্ঠাবাষির্কী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের হল এলাকা। ছবি : নাছির উদ্দীন আবির


বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন মানে আমাদের সবারই জন্মদিন। দিনটি অত্যন্ত আনন্দের। এই আনন্দক্ষণে আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারিসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।

লেখক : অনি আতিকুর রহমান
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল : aanirbanbd@gmail.com