গেরিলা: একাত্তরের অগ্নি-বর্ণমালা

226

পিয়াস মজিদ

মনে আছে স্টার সিনেপ্লেক্সে নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত ‘গেরিলা’ মুভিটির প্রিমিয়ার যখন দেখি তখন সিনেমাঘরটি যেন তার সীমা-পরিসর ছাপিয়ে বিশালাভা নিয়ে দেখা দিয়েছিল আমাদের, দর্শকদের কাছে। প্রকৃত মুভির গুণই তো তাই। সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাসে এবং এক মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মিলিত রসায়ন ‘গেরিলা’। মুভির কেন্দ্রভূমিকায় একাত্তরের আভা আর জয়া আহসান


‘গেরিলা’ আর দশটা মুক্তিযুদ্ধনির্ভর মুভি থেকে আলাদা নানা জায়গাতেই। একাত্তর এখানে কেবল গুলিবারুদ, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের আখ্যান নয়। কিংবা একাত্তর এখানে পুরুষের বীরত্বগাথার একতরফা গল্প নয়। অথবা, একাত্তর এখানে সোজাসাপ্টা বিজয়ের কেতন নয়।
একাত্তর এই মুভিতে উপস্থিত হয়েছে একাত্তরের অভিঘাত নিয়েই। প্রথমত, এখানে নগরবাংলা ও পল্লীবাংলার সীমারেখা চুরমার করে দেয়া হয়েছে। ঢাকা ও জলেশ্বরী তাদের সমান গুরুত্ব নিয়ে সমবেত এখানে যা মুক্তিযুদ্ধের যথা-বাংলাকে তুলে ধরে।


স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির শ্রেণিগত নানা মাত্রা; যেমন-মহল্লার বয়স্ক রাজাকার থেকে সেনাসদরের চৌকষ হানাদার অফিসার ; উভয়ের ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে।
অবরুদ্ধ অঞ্চলের ভয়াবহ চালচিত্রকে রাজাকারদের বক্তব্য-সংবলিত দেয়াললিখন থেকে সহজেই যেমন আঁচ করতে পারে দর্শক তেমনি ‘পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে’র অরিজিন্যাল লোগোর ব্যবহার রেলপথের অংশটুকুকে দেয় প্রামাণ্যতা। রেলযাত্রার শ্বাসরুদ্ধকর অংশের প্রতীকী ব্যঞ্জনাও অসাধারণ। পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়েতে চড়ে মানুষ যেন গতিমান করছে বাংলাদেশমুখী নতুন অভিযাত্রাকে; এই বোধ দর্শকের মনে জন্মাতেই পারে।


সম্মুখযুদ্ধের সমান্তরালে গেরিলা- যুদ্ধের বিভিন্ন ফ্রন্ট এখানে পরিস্ফুট। যেমন সাংস্কৃতিক যোদ্ধাদের অবদান ও আত্মদান; প্রিয় সুরের আগুন থেকে আলতাফ মাহমুদকে তুলে নিয়ে মৃত্যুর আগুনে নিক্ষেপের নির্মমতা যেভাবে ‘গেরিলা’য় এসেছে তা মুক্তিযুদ্ধে সাংস্কৃতিক গেরিলা-লড়াইয়ের ব্যাপ্তিবিভার ইঙ্গিত রেখে চলে।
‘গেরিলা’র মৌল মহানতা নারীর একাত্তর-নির্মাণপ্রভায়। ‘বিলকিস’ চরিত্রে জয়া আহসান এখানে বোধ করি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয় উপহার দিয়েছেন জাতিকে। এখানে তার শৌর্য ও রুদ্ধশ্বাস, দোলাচল ও দৃপ্ততা, জনতার একজন ও একক অবস্থা; এমন পাশাপাশি পরিস্থিতিতে যুগজয়ী অভিনয় ‘গেরিলা’-কে অনন্যতা দিয়েছে। রাজধানীর সেনা-জলসায় ঢুকে গেরিলা-ভূমিকা পালন থেকে সুদূর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের সপক্ষে তার সাহসী ভূমিকা যেন মাহবুব আলমের সুবিখ্যাত বইটির শিরোনাম মনে করিয়ে দেয় আমাদের; ‘গেরিলা থেকে সম্মুখযুদ্ধ’।


নারীর লাঞ্ছিত দৃশ্যের পুন:ব্যবহারের পথে না গিয়ে নারীর যোদ্ধা-ভূমিকাকে এখানে কালোত্তীর্ণ মাত্রায় উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে।
পুরো বাংলার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর জাতিবিদ্বেষমূলক অবস্থান যেন ‘গেরিলা’র শেষভাগে বিলকিসকে ঘিরে কদর্য কথনেই পরিস্ফুট। কিন্তু এটা যেমন একটি মাত্রা তেমনি মূল মাত্রা অপেক্ষায় রাখে দর্শককে; যখন সব ‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়া’ বিলকিসের রূপকে গোটা বাংলাদেশ তাঁর অস্তিত্ব-অস্ত্র ফেটে পড়ে। বিলকিসের ভেতর যেন ভর করে দেশের সকল স্থানে যুদ্ধরত মানুষ, অবরুদ্ধ মানুষ এবং বিজয়-অপেক্ষায় থাকা মানুষ। বিলকিসের সামনে ভয় পাওয়া পাক-সেনা যেন পরাজয়ের প্রান্তে থাকা গোটা পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিমূর্তি। বিলকিসই যেন তখন আসন্ন স্বাধীন বাংলাদেশ ;একাত্তরের পবিত্র অাগুনে পুড়ে সোনা হওয়া খাঁটি বাংলা বর্ণমালা।

অনি/সিনেটিভি