আবুল কাসেমকে স্যালুট

345

মিনার মনসুর

উপন্যাসটির প্রশংসা প্রথম শুনি কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তক মেলায়। যখন শুনলাম, একই সঙ্গে ঢাকা ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রায় সাড়ে ৫শ’ পৃষ্ঠার ৮৫০ টাকা দামের বইটি উভয় বাংলায় বিক্রিও হয়েছে ভালো, বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম জানালেন, কথা সত্য।

মৌর্য-এর লেখক আবুল কাসেম সজ্জন মানুষ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে তিনি কেবল আমার সিনিয়র সহপাঠীই ছিলেন না, ছিলেন অতি আপনজনও। মেধাবী ছাত্র হিসেবেও সুনাম ছিল তাঁর। তবে লেখক আবুল কাসেম তখনো আমার অপরিচিত। মৌর্যবৃত্তান্ত তাঁকে বলতেই তিনি একদিন নিজেই ছুটে এলেন আমার কর্মস্থলে। ঢাউস সাইজের বইটি দেখে, সত্যি বলতে কী, ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম রীতিমতো। একদিকে দমবন্ধ করা দাপ্তরিক ব্যস্ততা, অন্যদিকে চোখের যে-অবস্থা তাতে বইটি শেষপর্যন্ত পড়ে উঠতে পারবো কিনা তা নিয়েই সংশয়ে ছিলাম।

কিন্তু অবিশ্বাস্য রকমভাবে, শুধু যে বইটি পড়ে ফেলেছি তাই নয়, পড়ে আনন্দও পেয়েছি। আর পড়া শেষ হয়ে যাওয়ার পর কিছুটা শূন্যতাও অনুভব করছি নিজের ভেতরে। যখন থেকে পড়তে শিখেছি তখন থেকেই ইতিহাস আমার সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। আর ভারতীয় ইতিহাস হলে তো কথাই নেই! সম্ভবত সে কারণেও ইতিহাসআশ্রিত এই অজটিল আঙ্গিকের উপন্যাসটি আমাকে বেশি করে আকর্ষণ করেছে।

লেখক আবুল কাসেমের মুনশিয়ানা প্রশ্নাতীত। দুই সহস্রাধিক বছর আগের প্রেক্ষাপটে রচিত এত বড়ো একটি উপন্যাসে পাঠককে ধরে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। সে কাজে তিনি বেশ ভালোভাবেই উতরে গেছেন। এখনকার প্রেক্ষাপটে উপন্যাসের আঙ্গিকটি অতি সরল মনে হলেও ভাষা ক্লান্তিকর মনে হয়নি। তবে কোথাও কোথাও তাড়াহুড়োর একটি ব্যাপার হয়ত আছে।

মাত্র কয়েক মাস আগে আমি দ্বিতীয়বারের মতো টলস্টয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ পড়ে শেষ করেছি। ওটি আকারে মৌর্য-এর দ্বিগুণ। বিষয় প্রায় অভিন্ন। মৌর্য পড়তে পড়তে মাঝেমধ্যেই আমার মন ছুটে যাচ্ছিল ফ্রান্স থেকে মস্কো পর্যন্ত বিস্তৃত সেই রণাঙ্গনে। কেন জানি না, মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্যের বিষাদময় প্রচ্ছন্ন একটি বাদ্যও যেন ভেসে আসছিল অজ্ঞাত কোনো উৎস থেকে। মৌর্য অবশ্যই একটি সুখপাঠ্য উপন্যাস। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, একটি মহাকাব্যিক সম্ভাবনার জোরালো আভাস সত্ত্বেও কেন যেন শেষপর্যন্ত সেটি হয়ে ওঠেনি।

বুদ্ধদেব বসু ‘মহাভারতের’ নায়ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। বলেছিলেন, অর্জুন নয়, যুধিষ্ঠিরই নায়ক। আমার তো মনে হয়, লেখকের সকল পক্ষপাত সত্ত্বেও ‘মৌর্য’-এর নায়ক চন্দ্রগুপ্ত নয়, চাণক্যই নায়ক। কিন্তু চরিত্রটির প্রতি সুবিচার করা হয়নি। রাবণের মতো যে মহাকাব্যিক বিশালতা নিয়ে চরিত্রটির উদয় হয়েছিল, সেই স্বরূপটি শেষ পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকেনি। কেন থাকেনি তা লেখকই ভালো বলতে পারবেন।

তার পরও আবুল কাসেমকে স্যালুট। অসাধারণ একটি কাজ করেছেন তিনি। আমাদের লেখকদের ক্রমবর্ধমান শ্রমবিমুখতা ও সহজ সিদ্ধি অর্জনের আত্মঘাতী প্রবণতার বিপরীতে বিস্তর শ্রম ও প্রেম দিয়ে যে নতুন পথের দ্বারোদ্ঘাটন তিনি করেছেন, সেটিই আমাদের কথাসাহিত্যের ভবিষ্যতের সিংহদ্বার হবে বলে আমার বিশ্বাস।

অনি/সিনেটিভি