একটি তারার পতন

213

প্রমিত সরকার দূর্বা

চলে গেলেন সত্যজিৎ রায়ের ‘অপু’, অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।আজ ভারতীয় সময় ১২টা ১৫ মিনিটে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে অভিনেতা, আবৃত্তিকার, কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

১২টা ১৫ মিনিটে তাঁর মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়া মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে হাসপাতালের ৪১ দিনের যুদ্ধ। হাসপাতাল সূত্র বলছে, কোভিড এনসেফ্যালোপ্যাথির কারণেই সব রকম চিকিত্‍সার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে।

প্রথমত তিনি ছিলেন অভিনেতা। কবিতাচর্চা, রবীন্দ্রপাঠ, সম্পাদনা, নাট্যসংগঠন তাঁর বিপুল বৈচিত্র্যের একেকটি দিক। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সবকিছু নিয়েই অনন্য।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ৩৪টি সিনেমার ভিতর ১৪টিতে অভিনয় করেছেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ১৯ শে জানুয়ারি ১৯৩৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিটি কলেজ, আমহার্স্ট স্ট্রিট, কলকাতা ) সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন । ১৯৫৯ সালে তিনি প্রথম সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘অপুর সংসার’ ছবিতে অভিনয় করেন । পরবর্তী কালে তিনি মৃণাল সেন, তপন সিংহ, অজয় করের মতো পরিচালকদের সাথেও কাজ করেছেন।

সিনেমা ছাড়াও তিনি বহু নাটক, যাত্রা, এবং টিভি ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন। অভিনয় ছাড়া তিনি নাটক ও কবিতা লিখেছেন,পরিচালনা করেছেন। তিনি একজন খুব উঁচুদরের আবৃত্তিকার।

চট্টোপাধ্যায় পরিবারের আদি বাড়ি ছিল (অধুনা বাংলাদেশে) শিলাইদহের কাছে কয়া গ্রামে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পিতামহের আমল থেকে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরা নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে থাকতে শুরু করেন।

সৌমিত্রর পিতৃদেব কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি করতেন এবং প্রতি সপ্তাহান্তে বাড়ি আসতেন। সৌমিত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন কৃষ্ণনগরের সেন্ট জনস বিদ্যালয়ে।

তার পর পিতৃদেবের চাকরি বদলের কারণে সৌমিত্রর বিদ্যালয়ও বদল হতে থাকে এবং উনি বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেন হাওড়া জেলা স্কুল থেকে। তার পর কলকাতার সিটি কলেজ থেকে প্রথমে আইএসসি ও পরে বিএ অনার্স (বাংলা) পাশ করার পর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ অফ আর্টস এ দু’বছর পড়াশোনা করেন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-এর সর্বপ্রথম কাজ প্রখ্যাত চলচিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের অপুর সংসার ছবিতে যা ১৯৫৯ সালে নির্মিত হয়। তিনি এর আগে রেডিওর ঘোষক ছিলেন এবং মঞ্চে ছোট চরিত্রে অভিনয় করতেন। ধীরে ধীরে তিনি সত্যজিৎ রায়ের ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেন।

তিনি সত্যজিৎ রায় নির্মিত বিভিন্ন ছবিতে বিভিন্ন চরিত্রে আবির্ভূত হন। তার অভিনীত কিছু কিছু চরিত্র দেখে ধারণা করা হয় যে তাঁকে মাথায় রেখেই গল্প বা চিত্রনাট্যগুলো লেখা হয়। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলির ভিতরে সব থেকে জনপ্রিয় হল ফেলুদা।

তিনি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় সোনার কেল্লা এবং জয় বাবা ফেলুনাথ ছবিতে ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন।

প্রথমে ফেলুদা চরিত্রে তার চেয়েও ভাল কাউকে নেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও তাঁর অভিনীত ফেলুদার প্রথম ছবি ‘সোনার কেল্লা’ মুক্তি পাওয়ার পর সত্যজিৎ রায় নিজে স্বীকার করেন যে তাঁর চেয়ে ভালো আর কেউ ছবিটি করতে পারত না।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান ‘Officier des Arts et Metiers’ পেয়েছেন । সত্তরের দশকে তিনি পদ্মশ্রী পান কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। পরবর্তী কালে তিনি পদ্মভূষণ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৮ সালে পান সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার। দু’ বার চলচ্চিত্রে জাতীয় পুরস্কার পান, ২০০১ ও ২০০৮ সালে।

২০১২ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার লাভ করেছেন।

সৌমিত্র অভিনীত কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
অপুর সংসার , ক্ষুদিত পাষাণ, দেবী , তিন কন্যা , ঝিন্দের বন্দী , অতল জলের আহ্বান , বেনারসী, অভিজান , সাত পাকে বাঁধা , চারুলতা , কিনু গোয়ালার গলি , বাক্স বদল, কাপুরুষ আরো অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করেছেন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এমনই এক শিল্পী, যাঁর মূল্যায়ন নিয়ে কোনো পণ্ডিতি-তর্ক তোলার অবকাশ রাখে না। বলা হতো সময়ের ধুলা তাঁর আভিজাত্যের সৌন্দর্য স্পর্শ করতে পারে না।

সেই সৌমিত্রর সময় আজ চিরতরে থেমে গেল, ৮৬-তে এসে থামলেন তিনি। চলে গেলেন সত্যজিৎ রায়ের ‘অপু’, অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

অনি/সিনেটিভি