‘সুফিয়াম সুজাত্যায়াম’ রিভিউ

214

সুফিয়াম সুজাত্যায়াম
ভারত, ২০২০
জনরা: মিউজিক্যাল, ড্রামা, রোমান্স
ভাষা: মালায়ালাম
দৈর্ঘ্য : ১২২ মিনিট
চিত্রনাট্য ও পরিচালনা : নারানীপুঝা শানবাস
প্রযোজনা: বিজয় বাবু
অভিনয়: জয়সূর্য, অদিতি রাও হায়দারি ও দেব মোহন প্রমুখ।
সঙ্গীত: মধুসূধানণ জয়চন্দ্রণ
চিত্রগ্রহণ : আনু মুথেদাথ
সম্পাদনা : দীপু জোসেফ

স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে প্রেম নরনারীর লীলার মধ্য দিয়েই প্রতিভাত হয় এমনটাই সনাতন ধর্মীয় দর্শনের গোড়ার কথা। রাধা-কৃষ্ণ, হর-পার্বতীর প্রেমের মতো ইসলামী সূফিবাদেও মানব-মানবীর প্রণয় স্রষ্টাকে পাওয়ার অন্যতম পাথেয় হিসেবে পরিগণিত হয়। আর এই প্রেমকেই উপজীব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন মালায়ালাম লেখক ও নির্মাতা নারানীপুঝা শানবাস।

বাকপ্রতিবন্ধী সুজাতা উচ্চ বর্ণের হিন্দু পরিবারের মেয়ে; স্থানীয় মুসলমান আধ্যাত্মিক সাধকের আখড়াতে শিশুদের ক্লাসিক্যাল নাচ শেখায়। সাধকের শিষ্য সিনেমার নাম ভূমিকায় আরেক চরিত্র সুফির সাথে সুজাতার প্রেমের সম্পর্ক এবং’অর্থোডক্স’ সমাজ কর্তৃক সেই আন্তঃধর্মীয় প্রেম গৃহীত না হওয়াই এই সিনেমার মূল প্লট। সুজাতার বাবা সুফিকে’প্রেম জিহাদী’ আখ্যা দেন এবং মেয়েকে দুবাই প্রবাসী রাজীবের সাথে বিয়ে দেন।

চলচ্চিত্রটির সামগ্রিকতা এতো সরল ও গদবাঁধা হলে এই রিভিউ লেখক লেখার তাগিদ এড়াতেই পারতেন। এখানে প্রেমের প্রকাশ ও বিকাশ একটু ভিন্ন। সুজাতা আর সুফির প্রথম সাক্ষাৎ বাসে। পরের সাক্ষাৎ পীরের দরগায়। সাধক ছিলেন সঙ্গীতানুরাগী যিনি স্পিরিচুয়াল সুরে ক্লারিনেট বাজান। তার সেই সংগীতের সাথে আধ্যাত্মিক নর্তক হিসেবে দেখা যায় সিনেমার নায়ককে, যার পায়ের বুড়ো আঙুলের ভরে শূন্যে দুহাত মেলে ক্রমাগত ঘুরতে পারা মুগ্ধ করে সুজাতাকে।

সাম্প্রদায়িক অসহিষ্নুতার যুগে নির্মাতা অসাম্প্রদায়িক বার্তার জন্য শুধু ভিন্ন ধর্মের প্রেমকেই বেছে নেন নি; মাজারের অন্তঃপুরে আলমারির উপর কুরআনের রেহেলের পাশে মদের বোতল কিংবা সুজাতার শোবার ঘরে বিছানার একপাশে টেবিলে রাখা শিব মূর্তি এবং আরেক পাশে দেখা যায় কুরআন শরিফ । নির্মাতার এই চেতনা দুই ধর্মের প্রতিক্রিয়াশীলদের কাছেই’ধর্মীয় অজ্ঞতা’ ও’বাড়াবাড়ি’ হিসেবে প্রতীয়মাণ হয়েছে । এর প্রভাব আইএমডিবি র্যাংকিংয়েও পড়েছে(৫.৪)।

সুফিবাদী মতাদর্শ এই সিনেমার শ্রেষ্ঠ দিক। সুফি আজান দিচ্ছে কিন্তু তা ঠিক প্রথাগত আযান না, এ যেনো হৃদয়ে তান সৃষ্টি করা সংগীত। এলাৰ্ম ক্লক বেজে উঠার সাথে সাথে সুজাতা জেগে ওঠে-সুফি ফজরের আযান দেয়- সেই আজানের সাথে কত্থক মুদ্রায় নাচে সুজাতা। অজানাকে এতোটা জীবনঘনিষ্ঠ ভাবে এর আগে আর কেউ কি উপস্থাপন করতে পেরেছে? যদিও আজানের সাথে নাচের এই কম্পোজিশন ইসলাম ধর্মের একটি বিশেষ গোষ্ঠি মেনে নিতে পারে নি।

সুজাতার অন্যত্র বিয়ে হয়, দশ বছরের অসুখি দাম্পত্য জীবনে সে একমুহূর্তের জন্য সুফিকে ভুলতে পারে না। এদিকে সুফি দীর্ঘদিন অজ্ঞাতবাসের পর মাজারের সাধক ও গুরুর কোনো এক মৃত্যুবার্ষিকীতে তার আখড়ায় ফিরে আসে। সে ওযু করে, কবর জিয়ারত করে, তার মোহনীয় কণ্ঠে ফজরের আযান দেয়, জামাতে দাঁড়িয়ে নামাজ পরে, শেষ সেজদায় যাওয়ার পর সে আর মাথা তুলে না। ইহলৌকিক প্রেমের ব্যার্থতা পরলৌকিক প্রেমের কাছে পৌঁছে দেয় সুফিকে।

আনু মুথেদাথ এর মনোমুগ্ধকর সিনেমাটোগ্রাফি এবং জয়চন্দ্রণ এর সুফিবাদী সঙ্গীতায়ন এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক।এই সিনেমার সঙ্গীত দর্শককে ভাবের জগতে নিমজ্জিত করে। শিল্প নির্দেশনা এবং স্পেশাল এফেক্টের যৎসামান্য কিন্তু কার্যকর ব্যবহার সিনেমার মাধুর্যকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। চলচ্চিত্রের শুরুতেই একটি ঝরাপাতার দীর্ঘ সময় ধরে উড়তে থাকা এবং সুফির চড়াই উৎরাই দিয়ে পথ চলা, আবার পানিতে পাতার পতন ও সুফির মৃত্যু প্রভৃতি মন্তাজ এর শৈল্পিক উদাহরণ দেখা যায় সিনেমাটিতে ।

কেন্দ্রীয় চরিত্রের নামমাত্র সংলাপের উপস্থিতি অনেকেএই সিনেমার সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখলেও অদিতি রাও এবং নবাগত দেব মোহন এর শক্তিশালী অভিনয় অনেক কথার চেয়েও বেশি কথা বলতে সক্ষম। যদি শুধু কান নয়, বরং শোনার মতো মন এবং মানসিকতা থাকে। তাদের অভিনয়শৈলী সব মহলের বাহবা কুঁড়িয়েছে।

এই সিনেমার দূর্বলতম দিক হলো কাহিনীর ছন্দপতন। নাম ভূমিকার চরিত্রের চেয়ে সুজাতার স্বামীর বেশি উপস্থিতি এবং কাহিনীর শুরুর অর্ধেকের সাথে শেষের অর্ধেকের সময় ও ক্রমপ্রবাহের অসামাঞ্জস্য স্পষ্টতঃ লক্ষণীয় ছিলো। প্রোডাকশন ডিজাইনের দুর্বলতার চাপ ছিল প্রকট। তাছাড়াও, নির্মাতার এক সিনেমাতে সবকিছু দেখানোর প্রবণতা দর্শক মনেবিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। অনেকের মতে এখানে নির্মাতার মোটিফ অপরিষ্কার। তিনি না-অধ্যাত্মবাদ, না-অসাম্প্রদায়িকতা ও না-প্রেমের গল্প এঁকেছেন সেলুলোয়েডে। অনেকে একে’গভীরতাহীন রূপকথা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

অনি/সিনেটিভি