স্বাপ্নিকদের সাথে, আগুনও নাচে

232

পিয়াস মজিদ

গিলবার্ট এ দেইরের ‘The Holy innocents’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত বার্নান্দো বার্তুলুচ্চির ইতালি, ফরাসি ও যুক্তরাজ্যীয় প্রয়াসের মুভি ‘দ্য ড্রিমারস’ (২০০৩) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে রুমমেটরা একসঙ্গে বসে, রাত জেগে প্রথম যখন দেখি তখন আমাদের অভ্যস্ত রুচির কাড়া-নাকাড়া কেঁপে ওঠেছিল যেন! দেখতে দেখতে ভেবেছি- এমনও মুভি হয়! দেখার পর ভেবেছি, এমনই তো হওয়ার কথা মুভির৷ শ্বাসমূলে গিয়ে নাড়া দেয়, জল-জমে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে পড়া বুকের প্রাঙ্গণে আগুনের আলপনা বিছিয়ে দেয়, ঘর আর বাইরের দুনিয়ার সীমানা ভেঙে ফেলে, ব্যক্তিমানুষকে সংকীর্ণ স্বপ্নের হাত থেকে রেহাই দিয়ে নিয়ে চলে বৃহৎ মুক্তিস্বপ্নের উদার অঙ্গণে।

এই মুভি ১৯৬৮ সালের আলোড়ন-তোলা ফরাসি ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষিতকে ধারণ করেছে- তথ্য হিসেবে এমনটা পাওয়া যাবে সর্বত্র। কিন্তু আমি বলব- ‘দ্য ড্রিমারস’ স্বপ্নের মোহন চোরাকারবারে দুঃসহ বাস্তবের দগদগে ঘায়ের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়ার চিরায়ত প্রেক্ষিত মূলত।

মার্কিন যুবক ম্যাথিউ। পড়তে আসে প্যারিসে।
ফরাসি ভাইবোন থিও আর ইসাবেল। তাদের বাবামা বেড়াতে গেছেন কোথাও আর ঠিক সেই সময়টাতেই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে তাদের সাথে দেখা ম্যাথিউর; যে কিনা প্রথাগত ভাল ছাত্র আর সুবোধ এক যুবক। অন্যদিকে থিও আর ইসাবেল বলা চলে একেবারেই উরাধুরা। কারণ সময়টা তাদের চেয়েও বেশি উন্মাতাল।

ছাত্র আন্দোলনের হলকা চতুর্দিকে। রায়ট। পুলিশ। লাঠিচার্জ। মিছিল। ফেস্টুন। স্লোগান। মানিনা। পুরাতন-পচা যা কিছু তার অবসান চাই৷ নতুনের গান গাই।

ইসাবেল আর থিওয়ের সঙ্গে পথেই দেখা ম্যাথিউর; যে আসলে তাদের বুকের বন্ধু হওয়ার অপেক্ষাতে ছিল যেন।
আর সকলেরই মূলগত ভালবাসার জায়গা-জুড়ে তো আছে ফিল্ম। ঐক্যের সূত্র শেষতক বসবাসের নৈকট্যে রূপ নেয়৷ ম্যাথিউ থাকতে শুরু করে ইসাবেল ও থিউদের বাসায়।

তারা একসঙ্গে থাকে, ঘুরেফিরে, পড়াশোনা করে, বিশ্বখ্যাত ফিল্মের দৃশ্য মনে করা, না-করা নিয়ে খেলায় নামে, ল্যুভর জাদুঘরে দৌড়ের বিশ্বরেকর্ড ভাঙতে প্রাণিত হয়। তাদের আলাপের আঙিনায় এসে হাজির হন চার্লস চ্যাপলিন, এরিক ক্ল্যাপটন কিংবা জিমি হ্যান্ড্রিক্স। কখনওবা তত্ত্বের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে জীবন্ত তর্কের মজলিসে চীন থেকে লংমার্চ করে ফ্রান্সের রাস্তায় তিন যুবকযুবতীর কাছে ছুটে আসেন মাও সেতুংও।

ম্যাথিউ তাদের সঙ্গে তাল মেলায় যদিও এতটা গতিমান সে নয়৷ তবে ইসাবেলের প্রতি অনুরাগ তাকে নামিয়ে আনে দ্বিধার পাহাড় থেকে সম্মতির সমতলে৷

কিন্তু, একি! একরাতে সে আবিষ্কার করে থিও ও ইসাবেলের নির্বিকার নগ্নতা। নিদ্রার নগ্নতাকে যেন তারা দুয়ো দিতে নেমেছে৷ যেন বলছে, সময়টা এতটাই নগ্ন বেহায়াপনা ও গণবিরোধী যে তাকে একহাত নিতেও তো খুলে ফেলতে হয় সব আভরণ, আবরণ।

ম্যাথিউকে যেন যৌন রক্ষণশীলতার ট্যাবু থেকে মুক্তি দেয় থিও ও ইসাবেল।
প্রিয় ফিল্মের আবেদনময়ী আর ম্যাথিউর যৌন অবদমনের ব্যারিকেড ভেঙে একাকার হয়ে যায়, মৈথুনের মহোল্লাস যেন এতকালের ঊষর মরুর বুকে তৈরি করে প্রার্থিত সমুদ্রের ঘরদোর।

আর অতঃপর তারা তিনজন৷ শয়নের সীমা ভেঙে দেয়া, যেন শ্বাসটুকু বিনিময় করতে কোনো প্রাচীর না থাকে৷

কিন্তু, হঠাৎ একরাতে তাদের নগ্ননিদ্রার বুকে একটা ঝড়৷ থিও আর ইসাবেলের মাবাবা ব্যাংকের চেকবই সংক্রান্ত কাজে ঘরে ঢুকে তাদের দেখে যেন শায়িত তিন নিষিদ্ধ সুন্দর। সংকোচে, বিস্ময়ে, ভয়ে বাবা-মা চলে যায়। তবে তাদের ফেলে যাওয়া ব্যাংকের কাগজ দেখে ইসাবেল বুঝতে পারে, যা হওয়ার হয়ে গেছে।

এবার তবে আগুনে আহুতি দেয়ার সময় এসেছে। রান্নাঘরে ঢুকে গ্যাস মাস্ক খুলে আবার শুয়ে পড়ে সে৷ পাশেই থিও, ম্যাথিউ। দূরত্ব চুরমার৷ কাছে এল গ্যাসের ধোঁয়া। মরতে হবে যে। আসন্ন মরার বিপুল আনন্দে এই বেঁচে থাকা কেমন পানসে লাগে।
ওদিকে বাইরের দুনিয়ায় আগুন লেগেছে। জানালা দিয়ে তারা দেখে শত শত প্রতিবাদী ছাত্রের মিছিলে মারমুখী পুলিশ। সংকীর্ণ বেঁচে থাকা যেমন, সংকীর্ণ মৃত্যুকেও তারা ঘৃণা করে৷ তাই আত্মহত্যার প্রিয়তা থেকে, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে রাস্তায়, মিছিলের সাথীরা যেথায়।

ইসাবেল, থিও প্রাণপণে লড়ে। ম্যাথিউ পিছু হটে। থিও, ইসাবেল পুলিশের সাথে সংঘর্ষে নামে। ম্যাথিউ বলে, আন্দোলনকারীদের এমনটা করা উচিত নয়। থিও পুলিশের দিকে মলোটভ ককটেল ছুঁড়ে। ম্যাথিউ ইসাবেলকে সরিয়ে নিয়ে পালাতে চায় প্রেমের পথে। কিন্তু ইসাবেল ছুটে আগুন হাতে সামনে চলা ভাই থিওয়ের দিকে।
ইসাবেল কাকে বেশি ভালবাসে?
থিওকে?
ম্যাথিউকে?
না, এর উত্তর শোনার সময় তার নেই। আপাতত আগুনের উৎসবে শামিল না হলে সময় তাকে ক্ষমা করবে না যে!

এএমআর/সিনেটিভি