ফেরা, মানে ফিরে আসা নয়

593

গাজী তানজিয়া

ফিরে এসেছে।
কে?
ঐ যে গিয়ে দেখো, নীচতলার ড্রইংরুমে বসে আছে।
শমী রেডি হচ্ছিল বাইরে যাবার জন্য। ভ্র“-তে ভাঁজ ফেলে তাকাল তার ভাবীর দিকে!
তুমি সহজ করে কিছু বলতে পার না ভাবি?
সহজ করে কী বলব শমী? তোমাদের বাড়িতে কি সহজ কিছু ঘটে যে বলব!
রুপা ভাবীর দুচোখ দিয়ে যেন এখুনি আগুন ঝরবে। কিন্তু না সেই আগুন বিচ্ছুরিত হবার আগেই প¬াবন বইল। এই এক সমস্যা এদেরকে নিয়ে। এরা ভেতরের আগুনকে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। আগুনটা ফুঁসে ওঠার আগেই পানি ঢেলে দেয়। আর তাই যতো জটিলতা এদের জীবনে।
কী হয়েছে, পরি¯কার করে না বললে আমিই বা কি করে বুঝবো।
পারব না, তুমি নিজে গিয়ে দেখো। প্রেমিকের হাত ধরে স^ামীর ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়া অনেক দেখেছি। কিন্তু সেই পুরনো স^ামীর ঘরে আবার ফিরে আসা! ছি ছি ছি। কেউ কখনো দেখেছে না শুনেছে!
এই ভদ্রমহিলাকে নিয়ে এই এক সমস্যা। কোনো কথা সরাসরি বলবে না। বিরক্তির একশেষ! পৃথিবীটা যে কতো ফার্স্ট হয়ে গেছে- এখন যে আর প্যচাপেচির সময় নাই, সেই কথাটা একে কে বোঝাবে। তার তুলনায় ভাইয়ার প্রথম ¯ত্রী কণক ভাবি ছিল অনেক স্ট্রেইট-ফরোয়ার্ড ধরণের মহিলা। অন্য দিকে তার ঐ সহজ করে বোঝা বা পৃথিবীর তাবৎ ব্যপারগুলোকে সহজ করে দেখতে গিয়ে তিনি তাদের সংসারে বিশেষ করে ভাইয়ার জীবনে যে গেরো বাধিয়ে দিয়ে গেছন তাতে করে তার কথা আর মনে না করাই ভালো।
মুহূর্তে শমীর ম¯িতস্কের ভেতর দিয়ে বর্শার ফলার মতো এক ঝলক বিদ্যুৎ খেলে যায়। তাহলে কি কণক ভাবী? ফিরে এসেছেন! নীচে ড্রইংরুমে বসে আছেন? আর সেই কথাটাই রুপা ভাবী উচ্চারণ করতে পারছেন না?
কে এসেছে ভাবী? ¯পষ্ঠ করে বলত, নীচে কে এসেছে? কণক ভাবী না তো?
রুপাভাবী কোনোভাবে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে তার ¯হুল শরীরটা নিয়ে শমীর ঘর থেকে বের হয়ে যেতে যেতে বলল, ‘হ্যা’।
শমীদের বাড়ির ড্রইংরুমটা নীচতলায়। ল¤বা ড্রইংরুমে সাজিয়ে রাখা সারি সারি সোফার ঠিক প্রান্তের সোফাটায় বসে এ সপ্তাহের টাইমসের পাতা ওল্টাচ্ছেন কণক। পরণে হালকা নীলের ওপরে সাদা যশোর-স্টিচের কাঁজ করা বারগেন্ডি শাড়ী। গলায় মুক্তোর মালা, কানে ছোট্ট মুক্তোর দুল, কপালে গাঢ় নীল টিপ। সারা ঘরে এক অদ¢ুত স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিয়ে বসে আছেন তিনি। বসবার ভঙ্গিটা রাজেন্দ্রাণীর মতো মনে হলো শমীর কাছে। এক সময় তিনি কবিতা লিখতেন, বইও ছিল একটা। এখনো লেখেন কি না শমী জানে না। চাকরী বাকরী নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকতে হয় যে, পত্রিকার সাহিত্য পাতা আর পড়া হয়ে ওঠে না।
শমীকে ঢুকতে দেখে স্মিত হেসে উঠে দাড়ালেন তিনি। কণক ভাবীর এই সৌজন্যবোধ বরাবরই ভীষণ মুগ্ধ করে তাকে। কেমন আছো? ‘ভাবী’ কথাটা বলতে গিয়েও বলল না সে। শমীর বলতে অসুবিধা নেই কোনো; শেষে তিনি কিছু মনে করেন, তাই বলল না।
কণক তেমনি মিষ্টি হেসে বললেন, ভালো, তুমি ভালো তো?
হ্যা। বসো পি¬জ!
বাবা এখন কেমন আছেন?
বাবার অসুস্থতার কথা তুমি জানো?
হ্যা, ইনফ্যাক্ট বাবাকে দেখতেই এতোদূর আসা।
শমীর চোখে স্পষ্ঠতই কৌতুহলের ছাপ পড়ল। তুমি কী করে জানলা? আই মিন তোমাকে কে বলল?
তোমার ভাইয়া।
ভাইয়া! শমীর যেন বিস্ময়ের আর সীমা থাকে না। তার মানে রুপা ভাবির সন্দেহ ঠিক!
হ্যা তোমার ভাইয়াই জানিয়েছেন আমাকে।
মানে? কথাটা বলতে না চাইলেও মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো।
মানে খুব সহজ। বাবার সাথেতো আমার বরাবরই যোগাযোগ ছিল।
বাবার সাথে?
হ্যা শমী তুমি এমন একজন বাবার মেয়ে, এমন সৌভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে কম মানুষই জন্মায়।
সেটা আমি জানি।
জানবেতো অবশ্যই! মানুষের মহানুভবতা তো কখনো চাপা থাকেনা। এমন একজন জাস্টিজ।
হ্যা, শুধু নিজের পরিবারে সদস্যদের ব্যপারেই হয়তো উদাসীন ছিলেন। যাক্, এসব কথা এখন বলতে চাচ্ছি না। বাবার শারিরীক অবস্থা এখন খুব একটা ভালো না। আর্টিফিশিয়াল রেসপিরেটর দিয়ে রাখা হয়েছে।
বল কি! আমাকে তো এটা জানানো হয় নাই।
না, গত কাল রাতেই দিয়েছে। এর আগে ঠিকই ছিল।
বাবার অসুস্থতা নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতা। হসপিটালে ভর্তি হতে না চাওয়া। সার্বক্ষণিক দুজন নার্স ও একজন হাউজ ফিজিসিয়ানের তত্বাবধানে থাকা- আরো কতো কি। কিন্তু শমীর এখন কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে না। তবে সে যেন এই মুহূর্তে বলবার মতো কোনো কথাও খুঁজে পাচ্ছে না এমন ভঙ্গিতে বলল, আর ভাইয়া? ভাইয়ার সাথে দেখা হয়েছে তোমার? সে তো বোধহয় এখন বাড়িতে নাই। আজ এতো সকালেই অফিস চলে গেল!
এ নিয়ে তুমি ভেব না, তোমার ভাইয়ার সাথে আমার দেখা হয়েছে। তিনি আমাকে এয়ারপোর্টে আনতে গিয়েছিলেন। আর আমাকে বাড়িতে পৌছে দিয়েই তিনি অফিস গেলেন।
ভাইয়া! শমী এবার রুপার চেয়েও বিস্মিত ভঙ্গিতে কণকের দিকে তাকায়।
কিন্তু বাবা যে বাড়িতে নেই, তাকে যে হসপিটালে শিফট করা হয়েছে সেকথা তো তোমার ভাইয়া একবারও বলেনি। তাহলে আমি..।
বাবা বাড়িতেই ছিলেন, তাঁকে গতকালই হসপিটালে শিফট করা হয়েছে । আসলে সব রকম সাপোর্ট তো বাড়িতে দেয়া স¤ভব না।
হ্যা বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি যদি বিষয়টা আগে জানতে পারতাম..! আই মিন তোমার ভাইয়া তো এয়ারপোর্টে কিছুই বললেন না। শুধু শুধু…, কথা শেষ করেন না কণক। আবার অস্থিরভাবে টাইমসের পাতা ওল্টাতে লাগল।
আর এই সুযোগে শমীর মনের মধ্যে হাজারো প্রশ্ন কিলবিল করতে লাগল। অথচ সৌজন্যবশত কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারছে না। তাহলে কি রুপা ভাবির সন্দেহই ঠিক? কণকভাবি পাকাপাকিভাবে ফিরে এসেছে? ভাইয়াই তাকে নিয়ে এসেছে? আর তাই রুপা ভাবির এই প্রতিক্রিয়া? তাহলে কণক ভাবির সেই প্রেমিক যার কাছে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন সে-ই বা কোথায়? বেঁচে আছে? মরে গেছে, না কি মোহ কেটে গেছে!
আড়ষ্ঠতা, সৌজন্যবোধ, ভদ্রতা, এই সব ছিন্ন করে বের হয়ে শমী কিছুতেই কোনো প্রশ্ন করতে পারে না। তাই খুব স^াভাবিক ভঙ্গিতে বলল, চা খাবা নিশ্চই?
চা-এর কথা শুনে কণক একটু নড়ে চড়ে বসল। এক কাপ চা পেলে বেশ হয়! তাই বলল, হ্যা অবশ্যই। তবে রেড-টি।
ওহ্ শিওর! আমি জানিতো তুমি রেড-টি খাও। তার আগে তুমি একটু ফ্রেস হয়ে নাও- এতোটা পথ জার্নি করে এসেছো। কণক এবার বেশ ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, আসলে শমী আমি এসে বোধহয় তোমাদেরকে একটু সমস্যায় ফেলে দিলাম। তোমাদের বাড়িতে ওঠার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না; আমি হোটেলেই উঠতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার ভাইয়া এতো জোর করলেন!
আচ্ছা একট প্রশ্ন করি, কিছু মনে করবা নাতো?
মনে করবার মতো কিছু?
না, অতটা সীমা লংঘন আমি করব না কখনো। সেই সৌজন্যবোধটুকু আমার আছে।
আমি সেটা জানি, ইউ ক্যান আসক।
ভাইয়ার সাথে তোমার কী ধরণের যোগাযোগ ছিল বলতো?
কণক মুখে কিছু বলল না, একবার শুধু তাকাল শমীর দিকে। সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল যে কারণে শমী খুব অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, না মানে এক ধরণের কৌতুহল থেকে জানতে চাইলাম আর কি, সরি।
নো, ইটস্ ওকে।
ভাইয়া! শমী ভেতরে ভেতরে ভীষণ অবাক হতে লাগল। এই ভাইয়াই তো ভাবি চলে যাবার পর তার ওপরে শোধ নিতে বছর না ঘুরতেই রুপা ভাবিকে বিয়ে করে নিয়ে এলো। তবে এটা ঠিক কণকের সাথে যে একবার জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার পক্ষে রুপা ভাবির সাথে এ্যাডজাস্ট করাটা খুব টাফ। ভদ্রমহিলার না আছে রুপ না আছে রুচিবোধ। তবে একজন বৌ ভেগে যাওয়া পুরুষের পক্ষে এতো দ্রুত সময়ের মধ্যে এর চেয়ে ভালো আর কি জোটানো স¤ভব ছিল। যদি না আগে থেকেই প্রেম ভালোবাসা কিছু একটা থেকে থাকে। সেটাতো আর ভাইয়ার ছিল না তাই রুপাই সই। কিন্তু সেই ভাইয়া তলে তলে আবার গিয়ে কণক ভাবীর কাছেই করুণা ভিক্ষা করল! কি আছে এই নারীর মধ্যে? যে কেউ তার আকর্ষণ এড়াতে পারে না। খুব বেশি সুন্দরী তো তিনি নন। শ্যামলা রঙ তবে চেহারায় ব্যক্তিত্বের প্রখরতা চোখে মুখে দ্যুতি ছড়ায় এই যা। তবে সেখানে মাস্টারনি ভাবের চেয়ে স্নিগ্ধতাই বেশি। বিদূষী তাতেও সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটাই কি সব? শুধুমাত্র এই কারণে কোনো পুরুষ তার আকর্ষণ এড়াতে পারে না? এও কি সম্ভব! এই ভাইয়াই না তার নাম শুনলেও ক্ষেপে উঠতো। কণক ভাবি বলল বাবার কারণে যোগাযোগটা হতো। তার মানে কি বাবার আনুকুল্য পাবার আশায়, সম্পত্তি বা অন্য কোনো জাগতিক কারণ কি এর মধ্যে থাকতে পারে?
চা কি তুমি বানিয়েছ?
কণকের প্রশ্নে স¤িবত ফিরল শমীর, হুম্ হ্যা।
তুমি চা টা খুব ভালো বানাতে পার তো!
থ্যাংকইউ।
আসলে শমী তুমি হয়তো ভাবছো আমি এলাম কেন?
বুঝতে পারছি বাবাকে দেখতে এসেছো। কিন্তু কেন, সেটা বুঝতে পারছি না। তবে একটা প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে আার সেটা হলো, বাবা-মা আমি বা ভাইয়া আমরা সবাইতো তোমাকে কম ভালোবাসিনি, কিন্তু তুমি আমাদের সবাইকে ছেড়ে , সব বন্ধন ছিন্ন করে চলে গিয়েছিলে কেন?
জানি উত্তরটা জানা তোমার জন্য খুব জরুরী, আমি হলেও তাই চাইতাম। ওয়েল, জানতে যখন চাচ্ছো তখন বলি, ভালোবাসা! আসলে ভালোবাসার একটা দাবী আছে। সেই দাবী চাইলেই কেউ উপেক্ষা করতে পারে না শমী! আমি অর্ককে যে ভালোবাসতাম শমী। কিন্তু সব মানবিক স¤পর্ক ভেদ করে ওর দেশ স্পেশিয়ালি ওর ধর্ম ও পারিবারিক পরিচয় আমার বাবা-মায়ের কাছে মূখ্য হয়ে উঠল। ও বিধর্মী কেন? ও অরফানেজে কেন বড় হয়েছে? ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি আমার বাবা- মায়ের একমাত্র মেয়ে তাই ওদের ইমোশোন, সামাজিক অব¯হান ইত্যাদি বিবেচনা করে ওদের অবাধ্য হতে পারিনি তখন। তাছাড়া অর্কের একটা মেইল। সব শুনে ও লিখেছিল।
সে যাক। আর তাই অর্কের কথাটাকেই বাস্তব ধরে নিয়ে শুধুমাত্র একটা সামাজিক রীতির বসবর্তী হয়ে তোমার ভাইয়াকে বিয়ে করলাম। ভেবেছিলাম সব ঠিক হয়ে যাবে। সত্যি বলতে কি জানো, তোমাদের কারো প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। তোমার ভাইয়া আমাকে ভালোবাসতেন সন্দেহ নেই, তাই খুব বেশি পজেসিভ ছিলেন। সব সময় সন্দেহের চোখে দেখতেন। কার সাথে কথা বললাম, কি করলাম। অথচ অর্কের সাথে আমার কোনো কথা হতো না তখন। তাই একদিন কি মনে হলো জানো, মনে হলো তোমার ভাইয়ার সাথে কি আমি প্রতারণা করেছি? একই সাথে অর্ককেও। ধীরে ধীরে এই বোধ এই অনুভূতি আমাকে কুরে কুরে খেতে লাগল। যতো ভেবেছিলাম সব কিছু স^াভাবিক হয়ে যাবে, ততই যেন সবকিছু আরো অস^াভাবিক হতে লাগল। ব্যপারটা অনেকটা এরকম, তোমাকে বুঝিয়ে বললে বুঝবে। তুমিতো এখন বড় হয়ে গেছো। ধরো, তুমি একজায়গায় ভীষণ জোরে ঠোকর খেলে। এই ধরো পায়ে বা গোড়ালীতে। মনে হলো, ও কিছু না। একটু পানি বা বরফ লাগিয়ে দিলে জায়গাটাতে। কিন্তু অনেক্ষণ পর দেখলে জায়গাটা ফুলে উঠেছে বা অস¤ভব ব্যথা হয়েছে। কালচে হয়ে গেছে। কিছুদিন পর হয়তো টিউমার হয়ে গেল। আমারও ঠিক ওরকম হয়েছিল। শুরুতে মনে হয়েছিল সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু যতোই দিন গড়াতে লাগল, ততোই একটা অদ¢ুত কষ্ট দানা বাঁধতে লাগল ভেতরে ভেতরে। সবার হয়তো এমন হয় না কিন্তু আমার হলো। একটা অস¤ভব ঘুর্ণিমান আবেগের সঙ্গে একটা অদ¢ুত কষ্ট। সঙ্গে তোমার ভাইয়ার সন্দেহ বাতিকও ক্রমাগত বাড়ছে। যা অনেকটা অত্যাচারের পর্য়ায়ে চলে গেছে।
আমিও যেন সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। শুধু একটাই ভাবনা, কি করছে অর্ক এখন আমাকে ছাড়া? কিভাবে চলবে ওর আমাকে ছেড়ে? ও প্রায়ই একটা কথা বলতো, ‘ ভালোবাসি শুধু- শুধু তোমাকে। এর কোনো ব্যত্যয় হবার নয়। ভালোবাসা আর ভক্তি কি খুব আলাদা কণক?’ সত্যিইতো আলাদা কি করে হবে? ধীরে ধীরে আমি যেন হয়ে পড়লাম জীবম্মৃত। সব দেখছি, অনুভব করছি, ঘুরছি, ফিরছি আবার যেন কোনোকিছুতেই নেই। কারণ কি জানো? অর্কের একাকীত্ব। ওর একাকীত্ব আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। আমার ব্যপারটাই এমন শমী। আমি যাকে ভালোবাসি তার আবেগ অনুভূতি গুলো যেন আমি নিজের চেয়েও বেশি অনুভব করতে পারি। আর অর্ক ছিল খুব দুঃখি একটা ছেলে। ওর পৃথিবীতে কেউ ছিল না। মা মারা গিয়েছিলেন ছোটবেলায়, বাবাও ছিল না। শিলংয়ের এক অরফানেজে ওর বেড়ে ওঠা। শিক্ষা দীক্ষা। ও খুব ভালো স্টুডেন্ট ছিল। তাই স্কলারশিপ নিয়ে ও পোস্ট ডক্টরাল করতে গিয়েছিল আমেরিকায়। ম্যাথমেটিক্সে ওর ব্রা ছিল টপোলজি। ওখানেই ওর সাথে আমার পরিচয় হয়। অর্ক একটু অন্য রকম। এই ধরো সাধারণ মানুষেরা যেমন হয়, ও ঠিক সে রকম না। ওর কোনো বন্ধু ছিল না। ভীষণ ইন্ট্রোভার্ট। সহজেই কারো সাথে মিশতে পারতো না। ওর জগৎটা ছিল অনেকটা বিষন্নতার জগৎ। আর সেখানে হঠাৎ একদিন আমি ঢুকে পড়লাম। ওর বিষন্ন ধূসর সেই জগৎটা হঠাৎই সবুজে, হলুদে, নীলে, রৌদ্রে-আলোকে ভরে উঠল। আমি জানি, আমি ভীষণ শূ²তার ভেতর দিয়ে ওকে অনুভব করতে পারতাম। কিন্তু সেই আমার কাছ থেকেই যে ও এতোবড় দুঃখ পাবে সেটা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। সমাজ, সংস্কারবোধের মিথ্যা অহংকারের কারণে ও আমাকে এতোটা ভালোবেসেও পাবে না! এটা আমি মানতে পারছিলাম না কিছুতেই।
এরই মধ্যে আমি জানতে পারলাম অর্ক খুব অসুস্থ। ওর থিসিস তখনো কমপি¬ট হয়নি। আমার মনে হচ্ছিল এর কারণটা আমি, আমিই। নিঃসঙ্গ অসহায় একটা মানুষ, সেই কোন দূর দেশে একা একা কষ্ট পাচ্ছে। তাও আমার জন্য, আমাকে ভেবে। এ কথাটা জানার পর আর আমি সমাজ, সংসার, সাংসারিক ধারণাবোধের গন্ডিতে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারছিলাম না। সব মানুষের নিঃসঙ্গতা, সবার একাকীত্ব, অসহায়ত্ব কিন্তু বাইরে থেকে বোঝা যায় না। শুধুমাত্র ভালোবাসলে বা ভালোবাসা থাকলেই এটা বোঝা যায়। বাইরে থেকে হয়তো সবাই ভাববে, এমনতো হয়ই। এ কি নতুন কিছু নাকি! ব্যর্থ প্রেম এসব আঁকড়ে আজকাল বসে থাকে কেউ? কিন্তু অর্ক সে রকম ছেলে না। আমি জানতাম ওকে। খুব গভীর সেই জানা, আর তাইতো। তাই আমি এতোটাই ব্যকুল হয়ে পড়লাম যে, প্রায় অসু¯হ হয়ে গেলাম। ঐ যে বললাম, যেন জীবম্মৃত।
আর আমার সেই ব্যপারটা পৃথিবীতে যেন একজনই বুঝতে পারলেন । তিনি তোমার বাবা। তিনি ছিলেন শ^শুর কম বন্ধুই বেশি। সেই ছোটবেলা থেকে তিনি তো আমার বাবারও বন্ধু। কী করে হলেন- সেটা একটা বি¯ময়ের ব্যপার যদিও। কারণ তাদের দুজনের মানসিক গঠন দুরকমের। যাক্ সে কথা।
তো বাবা একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ‘তোর কী হয়েছে আমাকে বলতো মা। সারাদিন কেমন মনমরা হয়ে থাকিস। মনে হয় যেন তুই ঘুরছিস, ফিরছিস, কথা বলছিস আবার যেন নেই। তোর সমস্যাটা কি মা? আমাকে বলতে যদি কোনো অসুবিধা না থাকে বলতে পারিস।’
আমার তখন মনের অবস্থাটা এমন ছিল যে, এই কথাটা শোনার পর আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। সব বললাম বাবাকে। তিনি বললেন, ‘তুই আমাকে এই কথাটা আগে বললি না কেন? বিয়ের আগে?’
বললাম, তাতে কী হতো? আপনি আমার বাবাকে তো চেনেন।
তিনি দীর্ঘশ^াস চেপে শুধু বললেন, হুম্। তা এখন তুই কি করতে চাস? কী করলে তুই শান্তি পাবি, স^াভাবিক জীবনে ফিরতে পারবি বলতো মা। আমি তোর জন্য এখন কী করি বলতো? এযে অন্যায়, এ যে ভীষণ অন্যায়!
আমি তখন বাবাকে বললাম, বাবা আমি একবার যেতে চাই ওর কাছে। শুধু একবার। ভয় নেই, আমি কথা দিচ্ছি বাবা, আমি আবার ফিরে আসবো। শুধু একবার। আমি জানি, আমি সেখানে গেলেই অর্ক সু¯হ হয়ে যাবে।
তারপর! একথা শুনে বাবা রাজি হয়ে গেলেন?
হ্যা হলেন। সারাজীবন যিনি ন্যায়ের পেছনে ছুটেছেন, এক্ষেত্রে তিনি সংকীর্ণতা কিভাবে দেখাবেন শমী। তিনি যে কোনো সাধারণ মানুষ নন।
তারপর?
তোমার ভাইয়া আর আমার বাবা-মা কেউ রাজি ছিলেন না, বলাই বাহুল্য। এদের নিষেধ উপেক্ষা করেই আমি চলে গেলাম। আমি তখন প্রায় পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। ভালোবাসা ছাড়িয়েও বিবেকের দংশন আমাকে এতোটাই দুর্বল করে ফেলেছিল যে, আমার কিছু ভাববার অবকাশ ছিল না। তুমিতো জানোই আমি একটু অ¯িহর প্রকৃতির। তাই বাবাই সব ব্যবস্থা করে দিলেন।
দাড়াও। বাবা তোমাকে এই পারমিশন দিলেন। বাবা!
হ্যা।
বাবা তোমার বেলায় এতোটা উদারতা দেখালেন। কই, আমার বেলায়তো সেটা করলেন না! আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসতাম। ইনফ্যাক্ট এখনো বাসি। ছেলেটা একজন মিউজিশিয়ান। আর সে কথাটা বাবাকে বলতে সোজা না করে দিলেন। আর কারণ হিসেবে ঐ ওর বাবার স্যোসাল স্ট্যাটাস এর কথা বললেন। সেক্ষেত্রে তোমার ব্যপারটা এতো সহজে মেনে নিলেন কি করে?
আসলে শমী এখানে এক্সপেকটেশন এর একটা ব্যপার আছে। বাবা হয়তো তোমাকে নিয়ে বেশি কিছু এক্সপেক্ট করেছেন, তাই। তাই তোমার জীবনটা উনি একটা পরীক্ষার ভেতর দিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। আর আমাকে নিয়ে তার হয়তো কোনো এক্সপেকটেশনই ছিল না। আর পরীক্ষার কথা যদি বল, সেটাতো জীবন অনেকবার আমার কাছ থেকে নিয়েছে।
কিন্তু আমি একটা ব্যপার বুঝতে পারছি না। বাবা সব ব্যপারে এতো ডিসিপি¬ন্ড, এতো কঠোর- আর তোমাকে এমন একটা অনুমতি দিয়ে দিলেন?
বাবার কাছে হয়তো এটা অন্যায় মনে হয়েছিল।
অন্যায়! কোনটা- ভাইয়ার জীবনে তোমাকে টেনে টুনে বসিয়ে দেয়া? নাকি ভাইয়ার জীবন থেকে তোমাকে সো-কলড মুক্তি দেয়া। কোনটা অন্যায় মনে হয়েছিল বাবার কাছে বলতে পার?
প্রথমটাই। আর সেটা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বলেই আমাকে যেতে দিয়েছিলেন। সবাই এই উদারতা দেখাতে পারে না শমী।
তারপর কী হলো? সেই মহামানবকে দেয়া কথা তুমি রাখতে পারলা না। তুচ্ছ মানুষের মতো ওয়াদা ভঙ্গ করলা?
আমার কথা এখনো শেষ হয়নি। লেট মি ফিনিশ শমী।
এরপর আমি গিয়ে পৌছলাম মোরহেড স্টেটে। অর্ক তখনো হসপিটালে। অতিরিক্ত মেন্টাল স্ট্রেসের কারণে ওর নার্ভের ওপরে প্রেসার পড়েছিল যে কারণে কমপি¬কেশনগুলো দেখা দেয়। অর্ককে যেন চেনাই যাচ্ছিল না। চমৎকার স^া¯হ্য ছিল তার। ল¤বা চওড়া সুপুরুষ হঠাৎ যেন গুটিয়ে ছোট্ট হয়ে গেছে। আমি যখন ওর রুমে ঢুকলাম, ও চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল। আমি ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই চোখ খুলল।
জানো, একটুও অবাক না হয়ে, ও যেন জানতোই আমি যাবো এমন ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, কখন এলে কণক?
হঠাৎ আমার মনে হলো আমি হয়তো নিজেকে কণ্ট্রোল করতে পারব না। আমার গলা দিয়ে তীব্র কান্নার আওয়াজ বেরিয়ে আসবে। কিন্তু না, আমি নিঃশ^ব্দে আমার ক¤িপত একটা হাত রাখলাম অর্কের বুকে। আমরা দুজনেই তখন কাঁদছি ভেতরে- ভেতরে নিঃশ^ব্দে।
এরপর কিছুদিনের মধ্যেই অর্ক সুস্থ হয়ে উঠল। অর্ক তখন সুস্থই না, স¤পূর্ণ স^াভাবিক। আমাকে যে ফিরে আসতে হবে এ ব্যপারে ওর ভেতরে কোনো বিকার দেখা গেল না বা দেখাল না। কারণ ও আমাকে আগে প্রায়ই বলত, ‘যদি কোনো কারণে আমাদের বিয়ে না হয়- তারপরও আমাদের বন্ধুত¦ থাকবে। এই আমিটা তোমাকে না পেলে কিছুই যে হবে না তা না। খুব স্থুল একটা জায়গা থেকে হয়তো কাঁদবে। আর চেষ্টা করবে সেই আমিটার কাছে প্রতি মুহূর্তে তোমাকে খুঁজে নিতে। খুঁজে পাবেও হয়তো। সেই খুঁজে পাওয়ার ভেতরে শরীর থাকবে না। শারিরীক উত্তাপ আর শরীরের যতো বহ্নিময় গল্প হবে না। রাতভর লুকোচুরি আর সহস্র চাঁদের গল্প, আর সেই গল্পের রাস্তা ধরে আগ্নেয় প¬াবনে ডুবে যাওয়া হবে না। হয়তো এসব কিছুই হবে না আমাদের জীবনে। তবু তুমি থাকবে। আর থাকবেই। জীবনতো জয়মান কণক!’
আমি তখন অনেকটা নিশ্চিন্ত। শুধু ভাবছি ওর যদি একজন বন্ধু থাকতো! তাহলে খুব ভালো হতো। একজন মেয়ে বন্ধু। অন্তত আমাকে ভুলতে পারতো হয়তো।
এমন আকাশ-পাতাল ভাবছি। এমন সময় তোমার ভাইয়া ফোন করে বললেন, তোমাকে আর ফিরে আসতে হবে না। থেকে যাও ওখানে।
বললাম বাবা! বাবাকে যে আমি কথা দিয়েছি।
বিয়েটাতো তোমার আমার সাথে হয়েছে, না কি কণক?
বললাম হ্যা।
সেই আমি বলছি। এসো না। তুমি ফিরে এসো না পি¬জ! রেহাই দাও আমাকে।
তোমার ভাইয়ার ইগোকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে- আমি বাবাকে দেয়া কথা রাখতে পারিনি। তবে বাবার সাথে আমার যোগাযোগ ছিলই। কিছুদিন পর তোমার ভাইয়াও যোগাগোগ করতো মেইলে। ডিভোর্সের কিছু ফর্মালিটিজ ছিল। তারপরও তোমার ভাইয়া যোগাযোগটা কন্টিনিউ করে যাচ্ছিল।
সে যাই হোক। এরপর আমি অর্ককে বিয়ে করলাম।
তারপর তুমি সুখি হলে? তোমার বাবা-মা সবাইকে ছেড়ে?
জীবন অনেক বড় শমী। যতো বড় আমরা ভাবি, আর ভাবতে পারি- তার চেয়েও বড়। জীবনতো শুধু জীবন নয় আসলে মহাজীবন। জীবন আকাশের মতো। যা-ই হোক। যতো মেঘই জমুক আকাশে, কখনো গ¬ানি জমে না। কোনো মালিন্য লুকিয়ে থাকে না। কোটি কোটি বছর ধরে একই রকম। একই রং আর বর্ণচ্ছটা। দ্যুতিময় জীবন একই রকম। এ রকম যদি নাও হয়, তাহলে আস্তে আস্তে ভাবতে ভাবতে জীবনকে এরকম করে ফেলা যায়। কিন্তু শমী জীবনে সুখী হওয়াটা সত্যিকার অর্থেই বিরল এবং খুব বেশি আপেক্ষিক।
এতোদিন যত বিষোদগার ও অপবাদে কণককে জর্জরিত করার প্রচেষ্টা সে দেখেছে- সেটা যে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতার একটা দিক, এটা এই প্রথম উপলদ্ধি করল শমী। হ্যা কণক ভাবির চিন্তার ধারাটা হয়তো একটু অন্য রকম। সাধারণ মানুষ আপাত দৃষ্টিতে তাকে ভুল বুঝবে সন্দেহ নেই। তবে তাকে বুঝতে যে গভীর অন্তদৃষ্টি দরকার সেই দৃষ্টি কজনের আছে! শমীর বাবার ছিল। এই কথাটা ভাবতেই শমীর চোখ জলে ভরে উঠল। আর সেই চোখের জল চাপা দেয়ার কোনো চেষ্টাই সে করল না।