নোবেল পুরষ্কার নিয়ে বাঙালির হা-হুতাশ

305

যখনই সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয় কিংবা ম্যানবুকার প্রাপ্ত লেখকের নাম বাজারে আসে, তখনই আমাদের কিছু লেখক রে রে করে ওঠেন। বলেন, নোবেল কমিটি কিংবা ম্যানবুকার কমিটি বাংলার অমর সৃষ্টিগুলোর দিকে তাকালো না। তাকালে দেখতাম তারা যাদের পুরস্কৃত করেছে, তাদের চেয়ে কোটি গুণ বেশি উচ্চমানের সাহিত্যকর্ম আমাদের আছে।

এই হা-হুতাশকারীদের বক্তব্যের সঙ্গে আমি আংশিক একমত পোষণ করি। সঙ্গে এও প্রশ্ন করি, অন্যকে যে দুষছেন, তার আগে ভেবে দেখেছেন, আপনারা ঘরের ভেতর কী করেন? নিজে শুদ্ধ করে দুই লাইন লিখতে জানেন না, অথচ করপোরেট পুরস্কার থেকে শুরু করে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার সবই তো বাগিয়ে নেন। অথচ আপনার চেয়ে কোটিগুণ যোগ্যতাসম্পন্ন লোকটিকে ছাইচাপা দিয়ে ঢেকে রাখেন। তখন লজ্জা করে না?

নিজের বস্তাপচা-আবর্জনা ইংরেজিতে অনুবাদ করে অ্যামাজনে ছাড়েন, কিন্তু যোগ্য ব্যক্তির ক্লাস ওয়ান মানের লেখাটি সারাবিশ্বের পাঠকের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা আপনার মনে থাকে না। তখন তো জীবনানন্দ-সুধীনদত্ত-আল মাহমুদ-শামসুর রাহমান-সৈয়দ হকদের অস্বীকার করে হলেও নিজেকে তাদের চেয়ে অধিকতর যোগ্য প্রমাণে ইঁদুরদৌড়ে লিপ্ত হন।

বছর বছর যে দেশে ও প্রতিবেশী দেশে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন হয়, সেখানে আপনারা কাকে কাকে নিয়ে যান? আপনাদের বান্ধবী, খালাতো ভাই, যারা এখনো দুই লাইন শুদ্ধ করে লিখতে জানেন না, এখনো কবিতার প্রধান অনুষঙ্গগুলো আয়ত্ত করতে পারেননি, এখনো কথাসাহিত্যের মূল দ্বন্দ্ব কী, চরিত্রের সঙ্গে সংলাপের, পরিবেশের সঙ্গে গল্পের সম্পর্ক কী, একই সময়ে কথক বিশ্বের দুই প্রান্তের দুই চরিত্রের বর্ণনার সময় কোন ভূমিকায় থাকেন, কিভাবে সেই বর্ণনাকে বিশ্বস্ত করে তোলেন, এসব বিষয়ে অ আ ক খ জ্ঞানটুকুও অর্জন করেননি, আপনারা তো আন্তর্জাতিক সম্মেলনমঞ্চে তাদেরই নিয়ে হাজির করেন। যখন এমন অথর্বদের হাজির করেন, তখন বিশ্বসভা বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে কী বোঝে? কী ধারণা পায়? এখন যে জীবনানন্দ-মানিক-তারাশঙ্কর-ইলিয়াসের নামে মুখে ফেনা তুলছেন, আন্তর্জাতিক সাহিত্যসম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেলে কখনো বলেন, ‘আমি অতি নগণ্য, আমাকে বাদ দিন। বরং কবিতার জন্য ময়ূখ চৌধুরীকে নিন, কথাসাহিত্যে হাসান আজিজুল হককে ডাকুক, প্রবন্ধে যতীন সরকারকে বলুন’? আল মাহমুদ-শামসুর রাহমানদের জীবদ্দশায় কখনো তাদের নাম প্রস্তাব করেছেন? কখনো নিজের নাম কেটে দিয়ে হলেও এই মহারথীদের নাম বসিয়েছেন? বসাননি। পারলে তালিকা থেকে তাদের নাম কেটে দিয়ে নিজেদের নাম বসিয়েছেন। তাহলে আজকে হায় হায় করছেন কেন?

সারাবিশ্বের মানুষ যেকোনো ধরনের প্রতিযোগিতায় নিজেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-যোগ্যদের মনোনীত করে পাঠায়, আর আমরা? আমরা নিজেদের বেড়ালকে টাইগার নামে ডাকি, আর তাকেই পাঠাই অন্যদের বাঘের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়। ফল কী দাঁড়ায়? প্রকৃত টাইগাররা আমাদের বেড়ালদের খেয়ে ফেলে। বেড়ালের নাম টাইগার রাখলেই সে হালুম হুঙ্কার ছাড়বে না, মিউ মিউতেই তার কাজ শেষ করবে।

জমিতে তিল ছিটিয়ে তালগাছ আশা করা যায় কখনো?

পর্যবেক্ষণ

মোহাম্মদ নূরুল হক