‘ইয়ুথ’ কুয়েটজি

220

নির্ভার সম্পর্কগুলো আমার বেশি পছন্দের।পরিবার তো অনেক পরে তৈরি হয়েছে।অনেক গহিন রূপকথা আছে এই পরিবার বহির্ভূত সম্পর্কগুলোতে।
কুয়েটজি বা কুটসির ‘ইয়ুথ’ পড়তে পড়তে আবার এইকথা মনে পড়ল।এবং স্পেসিফিক্যালি নারী ও পুরুষের সম্পর্ক।
আমরা ‘হিরোশিমা মন আমুর’-এ দেখেছি সদ্য পরিচিত দুজন নারী ও পুরুষও কেমন উথাল-পাথাল ভালোবাসায় মেতে উঠে অনন্তকে ছুঁতে পারে।
‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা’য় দেখেছি ভালোবাসা কেমন মৃত্যুকে ছুঁয়ে পল্লবিত হয়।
জীবনানন্দ তাঁর গল্প উপন্যাসে বারবার এমন একজনের কথা বলেন এ পৃথিবী একবার পায় তারে পায় নাকো আর!বলা যায় কুন্দেরা, দান্তে বা আরও কারও কারও কথাও।
তবে আজ অন্য কোনও কথা নয়।আজ শুধু কুটসির কথা বলব।তাঁর বই ‘ইয়ুথ’-এর কথা।এটি তাঁর আত্মজীবনী।তাঁর যৌবনের দিনগুলির কথা।
যৌবন।এমনিতে তখন গুটিপোকা থেকে প্রজাপতি হওয়ার বয়স।
কুটসি তখন মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনির ‘দ্য একলিপ্স’ দেখে এসে রাতে স্বপ্ন দেখছেন নায়িকা মণিকা ভিত্তি তাঁকে আলিঙ্গন ও চুম্বন করছেন!মণিকা সম্পর্কে লিখছেন:
‘with her perfect legs and sensual lips and abstract look’
হন্যে হয়ে লন্ডনের পথে পথে ভারতীয় সেতারের সিডি খুঁজে বেড়াচ্ছেন।এজরা পাউন্ডের চিঠি, ইউলিসিস,ভিলোঁর টেস্টামেন্ট, মাদাম বোভেরি বা ললিটা তাঁকে প্লাবিত করছে।রাতে ঘুরে ঘুরে দুতিনটি কলেজে গিয়ে অঙ্ক পড়াচ্ছেন।
ক্লান্তি তাঁকে পেয়ে বসেছে।ক্লান্তির পর দান্তের নরকের একেকটি বৃত্ত তাকে আবৃত করছে।ভাবছেন ক্লান্তি তো হোল্ডারলিন,ব্লেক,পাউন্ড ও এলিয়টকেও পেয়ে বসেছিল।যদি না শিল্পের ‘শুদ্ধ আগুন’ তাঁদের না পোড়াত!
সাফারিং, ম্যাডনেস ও সেক্স হল এমন তিনটি পথ যে পথে শুদ্ধ আগুনে নিজেকে পোড়ানো যায়।কুটসি সাফারিং-এর তলানি দেখেছেন, পাগলামি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন।বাকি থাকলো সেক্স।
তো হাসপাতালে এক বন্ধুকে দেখতে গিয়ে আলাপ হল ২১ বছরের মেয়ে মারিয়ানের সঙ্গে।কুটসি বহুদিন পর ইংরেজি ছেড়ে আফ্রিকানে কথা বললেন।তাঁরা গদারের সিনেমা দেখতে গেলেন।নদীর ধারে ঘুরে বেড়ালেন।তারপর মেয়েটিকে নিয়ে কুটসি তাঁর ফ্ল্যাটে এলেন।
কী নিস্প্রিহ ভাবে তারপর ঘটনাগুলোর বর্ণনা করছেন।যা কুটসির মতো অসাধারণ লেখকের পক্ষেই সম্ভব!
‘They sit cross-legged on the thick pile carpet in the living room,with the door shut,talking in low tones’।
কী আশ্চর্য!একটি মাত্র শব্দ ব্যবহার করে তুতো বোনের বন্ধু মারিয়ানের মুড কুটসি বোঝাচ্ছেন,
‘…illegitimacy hangs excitingly around her’!
তারপর যা হবার তাই হল।মারিয়ান ভার্জিন।রক্তাক্ত হবার পর কুটসি যখন হাসপাতালে নেওয়ার কথা ভাবছেন মেয়েটি বললে তার প্রয়োজন নেই।
মেয়েটিতে ট্যাক্সিতে তোলার সময় মেয়েটির হাতে কিছু পাউন্ড গুঁজে দিতে চাইল কুটসি।মেয়েটি বললে তারও প্রয়োজন নেই।এবং এটাই তাঁদের শেষ দেখা ও কথা।
সত্যিই কি ততটা নির্ভার সম্পর্ক?তবে কেন কুটসির মনে পড়বে:
‘unsettling lovemaking’, ‘whispering women’, ‘bloody sheets’ আর ‘stained mattress’-এর কথা!
একটা ‘এপিসোড’ তবে এভাবেও শেষ হয়!তাঁর এই নিস্পৃহতা, শীতলতা ও অভদ্রতা হয়তো তাঁকে শিল্পী হিসেবে যোগ্য করে তুলবে একদিন।যৌনতার যে অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না তা পূর্ণ করবেন।
কী ভয়ঙ্কর কস্টিক এই ভাবনা!বন্ধনহীনতাই একজন লেখক তৈরি করে।একটা প্রশ্ন কুটসিকে কুড়েকুড়ে খায়।
যে মহিলা তাঁর প্যাশনকে আনলকড করল সে যদি তাঁর লিখনকেও মুক্ত করে তবে ভালোবাসা হয়তো যোগ্য হয়ে উঠবে কিন্তু লিখন কি তার মহিমা হারাবে না! কুটসি লিখন দ্বারা চিহ্নিত হতে চান!
ভালোবাসা যখন বন্ধন,শিল্পের মৃত্যু হয়।নির্ভার সম্পর্কই পারে একজন লেখক তৈরি করতে।
মারিয়ানরা কি বলি হন?কুটসি কিন্তু অকপট।কোনও আড়াল নেই।নেরুদারও ছিল না।প্রকৃত লেখক নিজের জীবন বাজি রাখেন লেখায়।নিজের তুচ্ছতাকে ব্যবহার করেন।
গুছিয়ে ভালো ভালো কথা লেখা খু ব সহজ।নিজেকে শবব্যবচ্ছেদের টেবিলে রেখে কাঁটাছেড়া করা সহজ নয়।কুটসিদের মতো কেউ কেউ পারেন।নির্ভার সম্পর্কের খাদ ও গলিগুঁজিতে পা রাখতে।

গৌতম মিত্র