খাতুনে জান্নাতের ১২টি কবিতা

450

দাগ
ছুঁয়েছিলে অঘ্রানের কালে—
মৌমাছিদের ডানা-ভাঙা শব্দে যখন
ধূপের গন্ধে পোড়ে গোপন প্রশ্বাস।
ফাগুনের উষ্ণতায়
নাভিমূল থেকে কাটে তন্দ্রা-ঘোর
কেটে ঝেঁটে ছুঁড়ে ফেলি পুরনো অসুখ।
এবার ঘামের গায়ে স্মৃতির চাদর
স্মৃতি হয়ে, মেঘ হয়ে এ ভরা ভাদর
এখন স্পর্শে রাখ স্পর্শের দাগ।


যত্ন
অতিথি পাখির নামে টিপসই দিয়ে
ফিরে আসো দ্রুতগামী ট্রেন
স্লিপারে পায়ের কাদা মুছে শব্দাতুর হও রেলওয়ে জংশন
তুমি পেন্টাগন ; নিজেই কর নিজের অপরাধ চুরি
ধুলা উড়বে বলে জল ঢেলে খালি কর নদী
কতটা ভরন্ত হলে তুমি ডুবে যাবে-
ডুবে যাবে জল ডুবডুব পাখি?
কেউ জানে না তোমার উড়াল যত্ন করে রাখি…


প্রতীক্ষা
জন্মের আরও আগে
স্নায়ুতে রোদের শিহর-চোখে দীপ্ত নীলিমা-
এক কোষী প্রাণ ভেঙে বহুকোষীর স্তরে
মুছেছি সরীসৃপ নখরতা-
খসিয়ে পাখির ডানা
শরীরে কামের গন্ধ- হৃদয়ে আশ্বিন দোলা
শরীরে ফুলের ডালি- নিঃশ্বাসে নির্যাস
শরীরে বাতাসের গতি- মননে আকাশ
হাঁটি হাঁটি পা পা
তোমারই প্রতীক্ষায়
এক-বিংশ শতকের দূষণ-মুখে তাকিয়ে….


চুমু
কাল দেখা হলে চুমু খাবো ঠোঁটে-
ঠোঁট থেকে তুলে নিও ভুল-চুমুর অদেখা দর্শন,

নিঃশ্বাস-হাহাকার…
‘ফুল নেবেন ফুল’ আগ্রহী ফুল-শিশুদের মতো
ভুল জমা আঙুলের ভাঁজে।
সে-সব কি মোছে স্পর্শের শিহরে!
কাল রাখবো বিকেল দুপুরের সাথে-
ঘরভাঙা আর্তনাদ, নিঃস্ব-কালিঝুলি রাত থেকে
খসুক অনাগ্রহে রোপিত রজন।
চুমুর সিঞ্চনে রূপকথার জিয়নকাঠি-স্পর্শ
স্পর্শ দাঁড়াক জীবনের সমান সমান…
কাল দেখা হলে চুমু খাবো ঠোঁটে—
ঠোঁট থেকে মুছো ভুল-চুমুর অদেখা দর্শন।


ব্রিজ
ভেঙে পড়ছে সরোদের ব্রিজ
কালাজ্বরে কাৎরাচ্ছে সামনের রাস্তা
কত সাধনা করলে সাধু ভেস্তে গেল ঘাম
গাছের ডালে ঝুলছে ঘুড়ি- চামচিকা
মিলে মিশে থাকে মুক্তি- বদ্ধতা
ব্রিজ ভেঙে পড়ছে
ঝুলে পড়ছে বাগান
চৈত্রের পুকুর থেকে উড়ে যায় মাছ
সম্পর্ক থেকে খুলে খুলে পড়ে হাড়
মাংসের ডিবিতে বসে খায় উঁইপোকা..
মুণ্ডহীন ভোর নাচে তাধিন তাধিন–


ঠকবাজ
দিনকে ঠকিয়ে গলিয়ে তলিয়ে তালগাছে মাথাটি লুকোলে
বাবুই’র ঘরবাড়ি ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হল
অন্তর্হিত হলে উত্তরি বাতাস
বহুদিন পর দেখা গেল খবরের শিরোণামে-
ভাঙা চিমনির সাথে তোমার মুখোশ ও কাটাহাত
একটি চোখও পেলার কাঁটাবিদ্ধ ; আরেকটি মার্বেল
থুতনিটা ঝুলে পড়েছে প্রায়…
পালাবার প্রাক্কালে শৈবাল উঠুনে আছড়ে বিছড়ে পড়লে
তারপর লেজকে পকেটে পুরে দৌড়ে পালালে
সে অবধি ক’টি সাংসারিক হাঁস গড়িয়ে গড়িয়ে হাসছে…


পদ্যের গুঞ্জন
তোর পাগলামীকে পদ্ম লিখে ফেলি

লিখি মাটি বৃষ্টিধোয়া বন
কচুপাতা জলের সরোবর
সকাল লিখি– দুপুর, সন্ধ্যা মন–
তোর পাগলামীকে লিখে ফেলি গান
এক জীবনে কী আর থাকে বল
কেঁচোর মতো হামাগুড়ি ইচ্ছে
নদীর মতো ছলাৎ ছলাৎ ছল
তোর পাগলামীটা লিখে ফেলি নীল
বিশাল আকাশ চোখের মতো চাওয়া
সলতেটাকে উস্কে দিয়ে বলি, কাঁদিস কেন
করই ফুলে বইছে দেখ হাওয়া


মায়াবতী
হাসছে ভাসছে মায়াবতী মহাকাল।
কারো উষ্মায় কেউ কেউ বাগিয়ে নেয় পার্থিব পদক।
মনভোলা কেউ কেউ দমনহীন চিৎকার।
ইচ্ছার রিংটোনে কেউ অচেনা সংগীত।
স্বার্থান্ধ, ঈর্ষা দহনে সংসার ছায়াহীন বৃক্ষ ।
হাসি না, কাঁদি না–
চোখে ঝুলে থাকে অমরাবতী বিস্ময়;
কানে বধিরতা—
এই ভালো চেনা নয় কেউ কারো;
সরল শিশুর ডাক, নির্জন দ্বীপের মতো স্থানুবৎ…


বিবেক
পড়ে থাকি এ শব্দায়মান শহরের একপাশে।
কঙ্কর জড়ানো ঘাস;
সময় শিথিল ঘাসের তলায় করাত বালুতে।
আমি দেখি-
কারও বিষণ্ণতা ও ছায়ায় কারও উন্নাসিকতার বিলুপ্তি;
এই ভালো কিছু নেই আকাঙ্ক্ষা বা আবদার।
জলে পাতা পড়ার শব্দে চতুর তক্ষক সতর্ক হয়
তেমনই সতর্কতা-
সুঁচের মতো বিবেক
হামাগুড়ি দিয়ে কোথাও লুকিয়ে থাকে….


গাঢ়-নীল
ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভুল করে প্রত্যাগত বেদনাকে

সাথী বানিয়ে লাভ নেই- জেনেও তো ছুঁই-
আস্তিন ও বোধে
বোধীভ্রমে ক্লান্তির ক্লেদ জমে।
নির্ভয় খুলে ধরে হিসাবের আদি-অন্ত ধারাপাত!
এ আমার দায়ভার নয়!
বিগত জনমের অথবা অনাগত কালে
তোমার আঙুল বেয়ে গড়িয়ে-পড়া রক্ত আমার আঙুলে
অথবা মরা-বিকেল গল্পে মেরুন রঙের শালিক-
ঠুকরে ঠুকরে খাবে- স্মৃতি,ঘ্রাণ,হর্ষ ও মর্ষতার দারুণ উপযোগ।
তারপরও সরাই কিছু গাঢ়-নীল।
উবে যাবার ভয়ে ঢাকি ঢাকনায়-
মাছিরা ঠিকই টের পেয়ে যায়!


দুসময় এবং আমরা
….
নীচে নেমে আসছে আকাশ
আর আমাদের ভাগ্য
ঝুলে আছে বাতায়ন
পৃথিবীর জন্য শোক প্রস্তাব গ্রহণ করছে জাতিসংঘ
পলায়নপর পথের উপর হুমড়ি খায় কোমরবাঁধা নারী
পুরুষেরা বেদম পেটাচ্ছে!
ছেঁড়া বাতাসের শাড়ি পরে রয়েছে সময়
বহুদিনের বস্তাবন্দী কথারা বাসি হয়ে গেছে ঢের আগে
কী কথা শোনাতে চাও কার্তিকের পূর্ণিমা!
ঘরবন্দী সন্তানেরা ঘুমিয়ে পড়েছে
উড়তে ভুলে গেছি আমরাও…

বাতিহীন পারাবার

আলো নিভে গেছে বহু আগে
বাতি জ্বালাবার কথা ভুলে গিয়ে সন্তানদের শোনাচ্ছি আঁধারের গল্প
গল্পগুলো সুমিষ্ট ফল আর নহরের স্রোতে প্রবাহিত
পথ চলতে চলতে পৃথিবীর মতো কাঁদে পথও
আমাদের পাথরের চোখেও কান্না থাকে
সে কান্না মায়াবী হলেও তার রেশ পৌঁছায় না কারও মনে
আসলে মন তো বহু আগেই পাথর বনের ঘোরে
আমরা আমাদের সন্তান জন্ম দিতে দিতে কখনো পাথর প্রসব করি
পাথর মাতাকে চেনে না, চেনে না বোনও
শুধু গড়িয়ে পড়তে জানে
দেশের বুকে পাথর পেরেক হতে জানে ..

খাতুনে জান্নাত