ধর্ষণ নির্মূলে সমাজপতি ও সরকারের ভূমিকা

239

জাহিদ হোসেন
মানুষের আদিম প্রবৃত্তির একটি অন্যতম প্রধান প্রবৃত্তি “যৌনাচার”। এটি মানুষের অবচেতন মনের এক স্বাধীন আচরণ। অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মানুষের মাঝে এই অবচেতন মনের গহীন চরাচরে চরিত্রের রূপকের প্রবৃত্তি অনুধাবন করাও আপনার আমার কারোরই পক্ষে সম্ভব না। এই জন্য যে, মানুষ জন্মগতভাবেই এক অদৃশ্য মনের অধিকারী। অবচেতন মনের সকল চাওয়া পাওয়া মানুষ সুযোগ পেলে অথবা সুবিধায় শক্তি প্রয়োগে চরিতার্থ করতে মরিয়া হয়ে উঠে।
মানুষের অন্তরজগতের যত সৃষ্টি শৈলী প্রতিভা মেধা জ্ঞান বোধ বিচার বিবেচনা ধৈর্য্য সহনশীলতা মননশীলতা আবেগ প্রবণ মহত্ত্ব বিকাশ মনোযোগ শিষ্টাচার সব কিছুই নিমেষেই ধ্বংস বা অবদমিত হয়ে পড়ে যখন মনের অন্যতম প্রবৃত্তি “যৌনাচার” তাকে শরীরে ও মননে দীর্ঘদিনে বা ক্ষণিক সময়ের মধ্যেই চরম আকারে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। এটি এই আচারের এক আদিতম ক্ষমতা।
ধর্ম রাজনীতি অর্থনীতি সমাজনীতি সরকারের আইননীতি প্রশাসনের সতর্কতা আইন শৃঙ্খলা কোন কিছুই তখন আর ধর্ষককে প্রতিরোধ করতে পারে না। হিতাহিতজ্ঞান ও বোধশূন্যতার এই বৈশিষ্ট্য মানুষকে আষ্টে পৃষ্ঠে ধরে বসে। এটাই অবচেতন মনের অদম্য এক শক্তি যা ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়ায় প্রজ্জ্বলিত হয়। এই যৌনাচার প্রবৃত্তি যেন মানুষকে বিপথগামী করতে না পারে, সে জন্যই ইসলাম বা মুসলিমদের সক্ষমতার বিচারে স্ত্রী’র সমমর্যাদা অধিকার প্রদান ও সম্মতিতে চতুর্থ বিয়ে পর্যন্ত জায়েজ করা আছে।
আর বিষয়টি বিংশশতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে সমাজ ও সরকারপক্ষ নেতিবাচক দৃষ্টিতে একাধিক বিয়েকে নিরূৎসাহিত করে আসছে। সেই সাথে দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত ও শতবছরের বা তারও বহু পৃর্বেকার যৌনকর্মীদের বসবাস বা আশ্রমাগার বা পল্লি গুলোকে নির্বিকারে বিংশ শতাব্দীরই শেষ দশক থেকে ধ্বংস বা উচ্ছেদ করে যাচ্ছে। এই উচ্ছেদ কিন্তু দেশব্যাপী এখনও নিয়মিত ও অনিয়মিত ভাবে চলছে। তারপর থেকেই মানুষের মনে যৌনাচার যেন স্বেচ্ছাচারিতার চরিত্ররূপে এক বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
মানুষের এই আদিম প্রবৃত্তি কোনভাবেই আইন দিয়ে অবদমিত করা যায় না, যাবেও না। আইনের কারণে কখনও ধর্ষক খুনেরও আশ্রয় গ্রহণ করে, যেন অপরাধীর কথা বলার বা অভিযোগের কেউ না থাকে। মিশরীয় ও গ্রীস সভ্যতাই শুধু নয় এর চেয়েও শত হাজার বছরের পুরোনো যে সকল সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, সেই সব সভ্যতার শাসক বা উপদেষ্টা বা জ্ঞানী বা ধর্মীয় নেতা সমাজের আড়ালে প্রচারবিমুখ পরিপ্রেক্ষিতে যৌনপল্লী যা যৌনাচার চরিতার্থের ব্যবস্থা করে দেয়ার পক্ষেই থাকতো। এটি মূলত একটি সুষ্ঠু সুন্দর পারষ্পরিক ভালবাসার পরিবার ও সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে দেশের প্রচলিত নিয়ম বলেই স্বীকৃতি ছিল।
আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের হাজার হাজার বছর পূর্ব থেকেই জাতি গোত্র ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মাঝে এই আদিম প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যৌনপল্লীর প্রচলন রেখেছিল। ফলে ধর্ষণের মতো মহা অপরাধের বিষয়টি থেকে সমাজ নিরাপদ থাকতো। যদিও শাসকদের কর্তৃক নারী নির্যাতনের বিষয়টি অবাধ ও একচ্ছত্র ছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের যৌনপ্রবৃত্তির কামনা চরিতার্থের ব্যাবস্থা যুগ যুগ থেকে শতাব্দী ছাড়িয়ে সমাজের মাঝেই নানাভাবে বা বিভিন্ন কায়দায় যৌনপল্লীর প্রচলন স্বীকৃত ছিল।


মোগল পাঠান বৃটিশ এমনকি পাক আমলেও আমাদের দেশে এর যথাযথ প্রচলন ছিল। সকল পেশার ও নানাবিত্তের মানুষের কথা চিন্তা করেই এই সকল পল্লীতে সুব্যবস্থা থাকতো। সমাজে মানুষের জন্য এমন ব্যবস্থা রেখেই ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। নতুবা আদিম প্রবৃত্তির কারণে অনেক মানুষ ধর্ষণের মত মহাপাপকেও আলিঙ্গন করেই বোধবুদ্ধিহীন বিবেকহীন এমনকি চেতনা বিবর্জিত হয়ে পড়ে। সেই সাথে দেশের সমাজও কলুষিত হয়ে উঠে।
রাজধানী ঢাকাতেই এই চল্লিশ বছর আগেও একাধিক যৌনপল্লী ছিল। ঢাকার আশে পাশে উপশহর গুলোতেও একাধিক যৌনপল্লী ছিল। সমাজপতিরা বিগত চল্লিশ বছরে ঢাকা ও এর উপশহর থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন শহর উপশহর বাজার গঞ্জ বন্দর থেকে ক্রমান্বয়ে উচ্ছেদ করে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রচেষ্টা অদ্যাবধি করে যাচ্ছে। একই কারণে বিগত চল্লিশ বছর থেকেই ধীরে ধীরে দেশে ধর্ষণের মতো অপরাধও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান সরকার যেমন মরণভেদী মাদকাসক্ত থেকে যুবসমাজকে বাঁচাতে উন্নত ও মান সম্পন্ন মাদকগ্রহণে শিথিলতা এনেছে। ঠিক তেমনি ধর্ষণের মতো মহাঅপরাধ থেকে যৌনপ্রবৃত্তির মানুষকে এবং পরিবারের ও সমাজের শিশু কিশোরী যুবতী নারীদের বাঁচাতে জনবহুল শহর উপশহরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যৌনপল্লীর প্রচলন করা জরুরী।
কঠিন আইনের কারণে সমাজে ধর্ষণ কমে যাবে এমন চিন্তা বা পরিকল্পনা অবাস্তব। তাই মানুষ পরিবার সমাজ ও দেশকে ধর্ষণমুক্ত করতে চাইলে সরকারের সূশাসনের জন্য অবশ্যই বহুল প্রচলিত যৌনপল্লীর বিকল্প নেই। যে সমাজপতিরা যৌনপল্লী উচ্ছেদে অগ্রনী ভূমিকা রেখেছিল আজ তাদের বুঝতে হবে তারা সমাজের ও দেশের সামাজিক পরিবেশ ও পরিস্থিতির সুনাম মর্যাদা শৃঙ্খলা ক্ষুন্ন করে কত বড় অপরাধের কাজটি করেছিলেন এবং এখনও অনেকেই করছেন।
আজ দেশে বিগত চল্লিশ বছর পূর্ব হতে যৌনপল্লী বা পাড়ার উচ্ছেদে যারা উল্লাসে মেতে উঠেছিলেন, আজ তাদের সকলকেই বুঝতে হবে- ধর্ষণের মতো অপরাধ দমনে আইন ব্যবহারের গুরুত্বতার চেয়ে সমাজে এ অপরাধ সংগঠিত যেন না হয় সেই পথ অবলম্বনই একটি সুষ্ঠু সুন্দর নিয়মতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্রের পূর্বশর্ত।
লেখক: চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিচালক কাহিনীরচয়িতা চিত্রনাট্যকার সংগঠক ও লেখক ।।