আবীর মুখোপাধ্যায়ের পাঁচটি কবিতা

376


অন্তরিন

নির্বাসন মানে এখন আর…
দূরতম দ্বীপে একাকী বন্দি নয়—
মনে মনে পরস্পর
ছুঁয়ে ছুঁয়ে দূরে থাকা।
আপন মনে নিবেদন,
তাহার জন্য একটি
অলীক ফুল রাখা।


গগন

ধানের গন্ধে পেরিয়ে যাচ্ছি মাঠ-প্রান্তর—
মাঠের শেষে ঘর।
মেহেদি গাছের একলা বেড়া,
অনিমিখে চেয়ে আছি, দূরের সন্ধ্যাতারা
এখন কি তুমি তুলসীতলায়,
এখনও দীপ জ্বালো?
মনে মনে সন্ধ্যারতি,
আকাশ কালো, আকাশ আলো!


প্রেম

লকডাউনের এক দুপুরে
সুনীলের নীরা ওল্টাতে গিয়ে হঠাৎ…
খামবন্ধ তোমার চিঠি পেলাম।
তেত্রিশ বছর পর,
কবেকার একটা চিঠি,
কখনও খাম খুলেও দেখিনি…!
তারপর দুপুর ফুরিয়ে বিকেল,
বিকেল ফুরিয়ে রাত।
অনেক রাত!
প্রবল হাওয়া—
লেখার টেবিল এলোমেলো।
সুলেখা কালিতে লেখা চিঠির শব্দ, যতি
ঘুরপাক খায় রাতের নিষিদ্ধ হাওয়ায়।
চিঠির সঙ্গে আমাকেও ডেকে নেয়
তেত্রিশ বছর আগের বন্ধ খামে!


মিছিলে ফেরাই ভাল

তিন দফা ছাঁটাইয়ের পর লোক কম,
দূরে, বহুদূরে এক-আধজন।
সেন্ট্রাল এসির দৌলতে ফাঁকা ফাঁকা নিউজ ডেস্ক যেন মর্গ।
এরইমধ্যে এজেন্সির পাঠানো গতানুগতিক করোনা-রাফাল-চিন, নয়া শিক্ষানীতি, বচ্চনসাহেবের ট্যুইট!
আপাতত এই লাশকাটা ঘরে…,
এর বাইরে তেমন কোনও খবর নেই!
হঠাৎ মেঘ দেখলাম—
শহিদ মিনারের মাথায়
ভাবলাম, তাকে একটা টেলিফোন করি…
বলি, মিছিলে এসো মেয়ে।
ভাবতে ভাবতে প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট থেকে হাঁটছি।
হাতের সিগারেট পুড়ছে—,
ছাই-ভস্ম পঞ্জাবির হাতায়!
একসময় মনে হল,
মিছিলের সঙ্গে হাঁটছে আমার পা দুটো।
আড়চোখে দেখি,
ভিড়ের মধ্যে এ ওর হাতে গুঁজে দিচ্ছে জরুরি ইস্তেহার।
কানে কানে রটছে লাল-শপথ।
মুঠো ভর্তি একে অপরকে উপহার দিচ্ছে সোনালি ধান।
ট্রাফিক সিগন্যালে আধপোড়া সিগারেটটা ঠেসে দিই।
তারপর ছায়াময় রেড রোড পেরিয়ে যেতে যেতে
পকেট থেকে আনমনে
ফেলে দিই
অফিসের রিপোটার্স নোটবুক, কলম, বেতনের চেক।
ময়দানের এলোমেলো হাওয়ায় পাক খেয়ে উড়ছে
সকালের শৌখিন খবরের কাগজ, শুকনো ঘাসফুল, খড়-কুটো
মিছিলের লাল নিশানের দিকে তাকিয়ে এগোতে থাকি,
আর হাতের মধ্যে টের পাই নতুন ধানের গন্ধ!
তখনও একবগ্গা এগিয়ে চলেছে মিছিল।
মাঠ-বন্দর— থেকে মিছিল এসে থামছে শহিদ মিনারের নীচে।
ভিড়ের হাতের মুঠো থেকে ধানের সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে আবার সারা শহর।
চারিদিকে জলা-জঙ্গল। বন-বাদাড়। পাখিদের কলরব।
ক্রমে একটি গ্রাম জেগে উঠছে মাটির গহনে।
ক্রংক্রিটের কলকাতা সরে গিয়ে জেগে উঠছে আদিগন্ত গাঁ-ঘর!
ভাবলাম তাকে একটা টেলিফোন করি…
বলি, শহিদ মিনারের মাথায় আকাশ এখন লাল
বলা হয় না!
বেজে বেজে একসময় থেমে যায় টেলিফোন।
সারা দুপুর হাঁটতে থাকি প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে,— সারা দুপুর।
আর ভাবি, এরচেয়ে মিছিলে ফেরাই ভাল!


ঘাতক

ছুঁয়ে দিলেই সংক্রমণ,
মৃত্যু অনাবিল
ছুঁয়ে দিলেই জেগে ওঠে
স্পর্শময় তিল।