আদিম সমাজে ছিল অবাধ যৌনাচার প্রথা

997

আদিম সমাজে ছিল অবাধ যৌনাচার প্রথা। বর্তমানে পশুদের মধ্যে যেমন। সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেন, ‘আদিম অবাধ যৌনাচার প্রথার ওপর সমাজ বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পেরেছিল বলেই মানুষের সমাজ আদিম খোলস ছেড়ে, বন্য-বর্বর জীবন ছেড়ে সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিল, যে সভ্যতা এখনও বহমান।’ অবাধ যৌনাচার প্রথা রদ করে মানুষ কেন স্থায়ী যৌনসম্পর্ক-প্রথার জন্ম দিল? কারণ সম্ভবত একটাই―জীবজগতে মানুষই একমাত্র জীব যার যৌনতার কোনো মৌসুম নেই। বাঘের যৌনমৌসুম আছে। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে মদন বাঘ মাদি বাঘের সন্ধান করে। গরুরও যৌনমৌসুম আছে। নির্দিষ্ট সময়ে সে ‘ডাক ধরে’, তখন তাকে নিয়ে যেতে হয় ষাঁড়ের কাছে। কুকুরের যৌনমৌসুম কার্তিক মাস এবং সাপের বর্ষা।
এভাবে প্রত্যেক প্রাণীরই যৌনমৌসুম আছে, সঙ্গমকাল আছে। মৌসুম ছাড়া তারা কামতাড়িত হয় না। নেই শুধু মানুষের। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে পুরুষের। তার হামেশা যৌনতার প্রয়োজন। প্রতি রাতে, প্রতি সপ্তাহে। সে কারণেই নারীর সঙ্গে সে বিয়ে নামক চুক্তি করে নারীকে সার্বক্ষণিক কাছে পাওয়ার জন্য এক কৃত্তিম সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। গত প্রায় দশ হাজার বছর ধরে সে সভ্য হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, অবাধ যৌনাচারকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু পেরে উঠছে না। মাঝেমধ্যেই এই কৃত্তিম সভ্যতার মধ্যে টাইপুন-হারিকন-আম্পানের মতো হানা দেয় তার আদিম অবাধ যৌনাচার প্রথা। জেগে ওঠে বুনো প্রবৃত্তি। সে তখন মেতে ওঠে ধর্ষণে। এই আদিম প্রবৃত্তির সঙ্গে যখন ক্ষমতা যোগ হয়, তখন সে হয়ে ওঠে ভয়ংকর পিশাচ। নরপিশাচ। তখন তার মধ্যে আর শুভাশুভের বোধ থাকে না। মানবতা, সভ্যতার লেশমাত্র থাকে না।
ধর্ষণপ্রবণতা রোধে প্রতিষ্ঠিত প্রধান ধর্মগুলো যে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ, তা আর লেখার অবকাশ নেই। সফল হলে খৃষ্টান, মুসলমান ও হিন্দুরা ধর্মের ভয়ে, ঈশ্বর-আল্লাহর ভয়ে ধর্ষণ করত না। অথচ করছে। ধর্ম কোনোভাবেই তাদের শিশ্নে লাগাম দিতে পারছে না। ধর্মশাস্ত্রের বিধি-বিধানকে তারা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে। ‘নব্বই পার্সেন্ট’ মুসলমান ধর্মসম্প্রদায় অধ্যুষিত দেশ বাংলাদেশও ধর্ষণে পিছিয়ে নেই। ধর্ষণ থামছেই না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসার শিক্ষকরাও মেতে উঠছে নারী ধর্ষণে। শুধু কি নারী ধর্ষিত হচ্ছে? না, ধর্ষিত হচ্ছে পুরুষরাও। পুরুষদের হাতেই। দুদিন আগে নারায়ণগঞ্জের এক কওমি মাদ্রাসায় এক ছেলেশশিুকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিনের পর দিন ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। দেশের অধিকাংশ কওমি মাদ্রাসায় অহরহ ধর্ষিত হচ্ছে ছেলেশিশু। গণমাধ্যমে প্রায়ই প্রকাশিত হয় সেসব খবর। কেউ প্রমাণ চাইলে পত্রিকায় প্রকাশিত শত শত রিপোর্ট দেওয়া যাবে।
সম্প্রতি নোয়াখালীতে বর্বোরিচত কায়দায় নারী নির্যাতনের ঘটনায় মধ্যযুগপন্থি দ্বিধাবিভক্ত হেজাফত নেতা জুনায়েদ বাবুনগরী দাবি তুলেছেন ধর্ষণ বন্ধে পর্দাপ্রথা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে নাকি ধর্ষণ কমবে। এই মাওলানার কাছে প্রশ্ন, সৌদি আরব বা ইরানে তো পর্দার কমতি নেই, তবু ধর্ষণ হয় কেন? মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীরা কেন ধর্ষিত হয়? ছাত্রীরা তো পর্দা করে। কওমি মাদ্রাসাগুলোতে ছেলেশিশুরা কেন ধর্ষিত হচ্ছে? এই ধর্ষণ বন্ধে কি ছেলেদেরও পর্দা করতে হবে? বাবুনগরী কি এর কোনো জবাব দিতে পারবেন? আমি নিশ্চিত, পারবেন না।
ধর্ষণের সঙ্গে পর্দার যে কোনো সম্পর্ক নেই, তার প্রমাণ জঙ্গলবাসী আদিবাসীরা। আফ্রিকা-আমাজনের বিস্তর আদিবাসী এখনো পোশাক পরে না। পরলেও খুবই অল্প। কই, তাদের সমাজে তো ধর্ষণ-প্রবণতা নেই। যুক্তরাজ্যের হার্টফোর্ডশায়ারের স্পিলপ্লাজ গ্রামের নারী-পুরুষ কেউ পোশাক পরে না। কই, সেখানে তো ধর্ষণ হচ্ছে না। ধর্ষণের সঙ্গে পর্দার যে কোনো সম্পর্ক নেই, তার প্রমাণ খোঁজার জন্য অত দূরে যাওয়ার দরকার নেই, বাড়ির পাশে আরশি নগরেই পাওয়া যাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের মধ্যে পর্দাপ্রথা নেই। অহমিয়া, খিয়াং, খুমী, গুর্খা, চাক, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, পাংখো, বম, মারমা ও লুসাই নারীরা পর্দা করে না। ম্রো নারীরা তো সবচেয়ে স্বল্পবসনা। ‘ওয়াংকাই’ নামে একধরনের ছোট পরিধেয় ব্যবহার করে, যা নাভীর নীচ থেকে হাঁটুর উপরিভাগ পর্যন্ত পরে থাকে। বুক থাকে উদোম। স্তনগুলো স্পষ্ট। কিন্তু তাদের সমাজে ধর্ষণ-প্রবণতা নেই।
ধর্ষণ রোধে ধর্ম ব্যর্থ। আইন কি সফল? মোটেই না। কঠোর আইন করেও পৃথিবীর দেশে দেশে ধর্ষণ রোধ সম্ভব হচ্ছে না। আমেরিকা, আফ্রিকা, সুইডেন, ভারত, ব্রিটেন, জার্মানি, কানাডা, শ্রীলংঙ্কায় সবচেয়ে বেশি ঘটে ধর্ষণের ঘটনা। এসব দেশে ধর্ষণের শাস্তিও কম কঠোর নয়। কিন্তু শাস্তি দিয়ে দমানো যাচ্ছে না। ইসলামি শরিয়ার দেশ সৌদি আরবে তো ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রকাশ্যে শিরোচ্ছেদ। তাতে কি সেখানে ধর্ষণ থেমে আছে? বাংলাদেশ থেকে নারীরা কর্মসূত্রে বা পাচার হয়ে সে দেশে গিয়ে যে অবিরাম ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, এ তো আমাদের জানা কথা। ইরানেও একই শরিয়া আইন। কিন্তু ধর্ষণ থেমে নেই। অহরহ চলছেই। একই সঙ্গে চলছে শিরোচ্ছেদও।
বাংলাদেশে চলমান ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বন্ধে নাগরিকদের কেউ কেউ দাবি তুলছেন ধর্ষকদের ক্রসফায়ার দেওয়া হোক, কেউ দাবি তুলছেন শিশ্ন কেটে দেওয়া হোক। কিন্তু মানবতাবাদীরা ক্রসফায়ার বা শিশ্ন কর্তনের বিরুদ্ধে। তারা চান বিচারিক পদ্ধতিতে আইনের প্রয়োগ। ক্রসফায়ার ও শিশ্ন কর্তনের দাবি যে বর্বর কায়দায় ঘটনা ঘটার পর বিচার-বুদ্ধি রহিত তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, তা সহজেই অনুমেয়। হ্যাঁ, কোনো ঘটনা যদি বুনো বর্বর কায়দায় সংঘঠিত হয়, তার উপসংহার বুনো বর্বর কায়দায় টানাটা তাৎক্ষণিক সমাধান হতে পারে। যেমন জঙ্গি দমন। জঙ্গিদের ধরে ধরে ক্রসফায়ার দেওয়ার কারণে জঙ্গিবাদ আপাতত নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এটা স্থায়ী সমাধান নয়। হতে পারে না। লাখ লাখ জঙ্গি এবং জঙ্গি মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি সুযোগের অপেক্ষায় ওৎ পেতে আছে। সুযোগ পেলেই আবার হাজির হবে চাপাতি নিয়ে, গ্রেনেড নিয়ে।
ক্রসফায়ার নয়, শিশ্ন কর্তন নয়, শিরোচ্ছেদ নয়, ফাঁসি নয়―তাহলে ধর্ষণ রোধের উপায় কী? উপায় হচ্ছে, মানুষের ভেতরের শুভসত্তাটিকে জাগিয়ে তোলা। আমার মধ্যে শুভ-অশুভ দুই সত্তার বাস। অবিরাম দুই সত্তার দ্বন্দ্ব চলছে, যুদ্ধ চলছে। যখনই অশুভ সত্তাটি শক্তিশালী হয়ে ওঠে তখনই আমার দ্বারা সংগঠিত হয় অশুভ কাজ। এই অশুভসত্তাকে ঘুম পাড়িয়ে শুভসত্তাকে জাগিয়ে তোলার উপায় কী? প্রথম উপায় হচ্ছে নারীবিরোধী মানসিকতা থেকে সমাজকে মুক্তি দেওয়া। এ দেশের সমাজ চালিত হয় ধর্ম ও রাজনীতি দ্বারা। ধর্ম ও রাজনীতি দিয়ে মানুষ যে সমাজ গড়েছে সেই সমাজে চুরি-ডাকাতি অপরাধ নয়, ঘুষ অপরাধ নয়, দুর্নীতি অপরাধ নয়, মারামারি হানাহানি অপরাধ নয়, ক্ষেত্রবিশেষ ধর্ষণও অপরাধ নয়। কিন্তু কোনো বিয়ে-বহির্ভূত নারী-পুরুষের সম্পর্ক গুরুতর অপরাধ। কোনো নারী কোনো পুরুষের সঙ্গে আড়ালে-আবড়ালে একটু কথা বললেই হলো। গেল গেল! সমাজ ধসে গেল! সব শেষ হয়ে গেল! শালিস বসিয়ে ওই নারীকে অপমান-অপদস্ত করো, প্রয়োজনে দোররা মারো, একঘরে করো, পিটিয়ে গ্রাম ছাড়া করো। আর পুরুষটি? ওকে হালকা-পাতলা ধমক দিয়ে দিলেই হবে।
মানুষের এই যে মানসিকতা, এটা শিখিয়েছে ধর্ম। সংস্কৃতিকর্মী বা বুদ্ধিজীবীরা সমাজ থেকে সরে গেছে বহু দূরে। একদা ক্লাবকে কেন্দ্র করে, সাংস্কৃতিক সংগঠনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হতো সমাজ। এখন সেই স্থান দখল করেছে মসজিদ-মাদ্রাসা। এখন সমাজ পরিচালিত হচ্ছে মৌলবি-মাওলানাদের দ্বারা, মসজিদ কমিটি দ্বারা। যে মসজিদ কমিটি সভাপতি সে-ই সমাজের হর্তাকর্তা। এই হর্তাকর্তা বা মৌলবি-মাওলানারা ঘুষের বিরুদ্ধে বলবে না, দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলবে না, চুরি-ডাকাতি-হানাহানির বিরুদ্ধে বলবে না; তাদের বলার একমাত্র বিষয় নারী, তাদের একমাত্র শত্রু নারী। তাদের কাছে নারী খারাপ, নারী দইয়্যুজ, নারী জাহান্নামের হানজাল (জ্বালানি)। পারলে তো নারীকে তারা জ্যান্ত দাফন করে। প্রয়াত হেফাজত নেতা আহমদ শফির সেই বহুল প্রচারিত উক্তিটি তো আমরা জানি। যিনি বলেছিলেন, ‘নারী তেঁতুলের মতো, দেখলেই লালা ঝরে।’ সম্প্রতি মাওলানা আবদুর রাজ্জাক ইউসুফ নামের ওয়াহাবিপন্থি এক মাওলানার ওয়াজের ভিডিও ক্লিপে দেখলাম, যেখানে সে বলছে, ‘নারীর জন্ম হওয়া কলঙ্ক, কুলক্ষণ, অমঙ্গল। নারীর কোনো আত্মা নেই। নারীর জন্ম হয়েছে সেবার জন্য। স্বামী স্ত্রীকে বিক্রি করতে পারে। স্ত্রী হচ্ছে বাড়ির সম্পদ, জিনিসের মতো। স্ত্রীকে নির্যাতন করা যাবে।’
আমি জানি না ইসলামি শাস্ত্রের কোথাও নারী সম্পর্কে এমন কুৎসিত-কদাকার মন্তব্য আছে কিনা। থাকলে কোনো কথা নেই। আবদুর রাজ্জাক তার শাস্ত্রের বাণীই প্রচার করেছে। কে গ্রহণ করবে আর কে করবে না, সেটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু যদি না থাকে, তবে এই মাওলানা যে নারী সম্পর্কে এমন কুৎসতি মন্তব্য করল, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? কেন সে এখনো দেশব্যাপী ওয়াজ করে বেড়াতে পারছে? কেন সাধারণ মানুষের মগজে সে নারীর বিরুদ্ধে এমন বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে? নারী সম্পর্কে এই নেতিবাচক মনোভাবের কারণেই নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের পিশাচরা এমন বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটাতে পেরেছে। তাদের এক হাতে ছিল ধর্ম, আরেক হাতে রাজনীতি। ফলে নারীটিকে নিপীড়নের সময় বুঝতে পারছিল না তারা যে একটি মহা অপরাধ করছে। কীভাবে বুঝবে? তাদের মগজ তো আগেই ধোলাই করে দিয়েছে ধর্ম। ধর্ম ও রাজনীতির নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা গ্রামবাসীও এই ঘটনার প্রতিবাদ করেনি।
নারীর বিরুদ্ধে ধর্ম বেপারিদের এই ধরনের প্রচারণা বন্ধ করা জরুরি। লাগাম টেনে ধরতে হবে নারীবিরোধী এই ধর্মদানবদের। সাধারণ মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে হবে নারী সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। সে দৃষ্টিভঙ্গি জাগিয়ে তোলার প্রধান মাধ্যম হচ্ছে অবিরাম সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যার প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে সংগীত, নাটক, সাহিত্য। একটা সময় প্রজন্মের সামনে সংস্কৃতির এ তিনটি উপাদান বিদ্যমান ছিল। মানুষের মুখে মুখে সংগীত ছিল, পাড়ায় পাড়ায় নাটক ছিল, বই পড়ার অভ্যাস ছিল। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা সমাজ থেকে দূরে সরে গেল। সংস্কৃতি চর্চার হাল ছেড়ে দিল। জায়গাটা শূন্য হয়ে পড়ল। শূন্যস্থান কি কখনো শূন্য থাকে? ভরাট হয়ে যায়। সংস্কৃতির শূন্যস্থানটা দখলে নিল ধর্ম বেপারিরা, যারা প্রতিনিয়ত নারী সম্পর্কে কুৎসিত মন্তব্য করে, নারীকে শিকল পরিয়ে ঘরে বসিয়ে রাখতে চায়, যারা সাধারণ মানুষের মনে নারীর বিরুদ্ধে বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে।
সংস্কৃতি চর্চা মানুষের শুভসত্তার বিকাশ ঘটায়। যে ছেলেটি গান করে, নাটক করে, সাহিত্যকর্ম করে, তার পক্ষে ধর্ষণ করা অসম্ভব। সংগীত, নাটক ও সাহিত্যকর্ম তার বিবেকের খাবার। এই খাবার দিয়ে সে বিবেককে সজীব রাখে। তার মধ্যে জাগ্রত হয় শুভবোধ। সেই বোধ দমিয়ে রাখে তার অশুভসত্তা। যখন সে কোনো খারাপ কাজ করতে উদ্যত হয়, তখনই তার সামনে দাঁড়িয়ে যায় বিবেক। পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে, উপজেলা ও জেলা শহরে সংস্কৃতিচর্চা নেই, প্রজন্মের শুভসত্তার বিকাশও নেই। প্রজন্মকে তো আমরা সংস্কৃতিচর্চায় ব্যস্ত রাখতে পারছি না। তাই বলে কি সে চুপটি করে বসে থাকবে? থাকবে না। সে আহ্বান করবে তার অশুভসত্তাকে। অশুভসত্তাকে লালন ও পুষ্ট করার জন্য তার প্রয়োজন দূষিত রাজনীতি। সে এক হাতে নেয় দূষিত রাজনীতির খড়গ, অন্য হাতে নেয় ধর্মের খগড়। দুই হাতে দুই খড়গ পেয়ে নিজেকে সে ‘হিরো’ ভাবতে শুরু করে। সে তখন আর মানুষ থাকে না, হয়ে ওঠে অমানুষ, নরপিশাচ। তখন তার কাছে ধর্ষণ কোনো ঘটনাই না।
বড় বড় স্কুল-কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়ে, মধ্যযুগীয় শিক্ষা ব্যবস্থার স্বীকৃতি দিয়ে ধর্ষণ রোধ করা যাবে না। তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ জাতি গড়ে তুললে ধর্ষণ রোধ করা যাবে না। শিক্ষার সঙ্গে থাকতে হবে সংস্কৃতির যোগ। সংস্কৃতির অবিরাম চর্চার পাশাপাশি চালাতে হবে ধর্ষণবিরোধী ব্যাপক প্রচারণা। নারী যে মানুষ, ধর্ষণের পাত্রী নয়―প্রজন্মের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে হবে এই বোধ। জাগিয়ে তুলতে হবে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। রেডিও, টেলিভিশন, পত্রপত্রিকাসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালাতে হবে নারীর প্রতি এই সহিংসতার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে এসিড-সন্ত্রাস বন্ধ করা গেছে। কীভাবে গেল? শুধু আইন প্রয়োগ করে? না, শুধু আইন প্রয়োগ করে নয়, বন্ধ করার পেছনে ছিল এসিড-সন্ত্রাস বিরোধী ব্যাপক প্রচারণা। প্রত্যেক প্রচার মাধ্যমে এসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রচারণা চলানো হতো। হলে সিনেমা শুরু হওয়ার আগে এসিড-সন্ত্রাস বিরোধী বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতো, পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতো, দেয়ালে দেয়ালে এসিড-সন্ত্রাস বিরোধী স্লোগান ও দেয়ালচিত্র আঁকা হতো। মানুষের শুভবোধের উন্মেষের লক্ষ্যে ধর্ষণ-বিরোধী প্রচারণায় সরকার তো বটেই, এগিয়ে আসতে হবে গণমাধ্যমকেও। এগিয়ে আসতে হবে সংস্কৃতিকর্মী এবং বুদ্ধিজীবীদেরও। তবেই দমতে পারে মানুষের ধর্ষণ নামক এই কুপ্রবৃত্তি। তবেই ঘটতে পারে মানুষের শুভসত্তার উদ্বোধন। তখন মানুষ হয়ে উঠবে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল, মানুষের প্রতি সংবেদনশীল প্রকৃত মানুষ।
মহাকালে রেখাপাত


স্বকৃত নোমান