মেয়েটা প্রতিরোধ করতে গিয়েছিল

308

মেয়েটা প্রতিরোধ করতে গিয়েছিল।১৯ বছরের একরত্তি ছোট্ট মেয়েটি কীভাবে যেন বুকে সেদিন অসীম সাহস সঞ্চয় করেছিল।আক্রমনকারীকে প্রতিহত করতে উদ্যত হয়েছিল।আর অনিচ্ছাকৃত আঘাতে আক্রমনকারীর মৃত্যু হয়।হ্যাঁ,নইলে মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হত সেদিন।মেয়েটির ভাষাতেই ‘আমার শরীর ছুড়ে ফেলা হত শহরের কোনও অজ্ঞাত কোণে’!এভাবে নয়তো ওভাবে।সবলদের হাতে দুর্বলেরা এভাবে যুগেযুগে মরে।কখনও জাতের নামে, কখনও দেশের নামে, কখনও ধর্মের নামে আবার কখনও লিঙ্গবৈষম্যর নামে।হ্যাঁ, মরে।মেয়েটি হয়তো ধর্ষিত হওয়ার হাত থেকে বাঁচল কিন্তু রাষ্ট্রের মিথ্যা সাজানো বিচারে মেয়টির ফাঁসি হল।যে মেয়েটি একটি আরশোলাকেও প্রাণে ধরে মারতে পারত না, সে নাকি পরিকল্পিতভাবে ছক কষে খুন করেছে।দেশটি ইরান।ইসলামিক রাষ্ট্র। যে ধর্মের নবী মায়ের গর্ভে থেকে মায়ের অপমান সহ্য করতে না পেরে বাঘ হয়ে অপমানকারীকে হত্যা করেছিলেন সেই দেশের এই বিধান।মেয়েটির নাম রেহানে জাবারি।২২ অক্টোবর ২০১৪ ভোরে ২৬ বছরের রেহানের ফাঁসি হয়ে যায়।মারা যাওয়ার আগে মা-কে একটি চিঠি লিখেছিল রেহানে।সব মেয়েদের কাছেই হয়তো মা শেষ আশ্রয়।সেই চিঠির প্রথমেই শেষবারের মতো মা ও বাবার হাতে চুমু খেতে না পারার দুঃখ প্রকাশ করেছিল।মাকে অতঃপর চিঠিতে লিখছে রেহানে:’মা, তুমি শিখিয়েছ অভিজ্ঞতা লাভ ও শিক্ষা পাওয়ার জন্যই আমাদের জন্ম। তুমি বলেছিলে, প্রত্যেক জন্মে আমাদের কাঁধে এক বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া থাকে। মাঝে মধ্যে লড়াই করতে হয়, সে তো তোমার থেকেই শিখেছি। স্কুলে যাওয়ার সময় তুমি শিখিয়েছিলে নালিশ ও ঝগড়াঝাটির মাঝেও যেন নিজের নারীসত্তাকে বিসর্জন না দিই। কত যত্ন করেই না মেয়েদের খুঁটিনাটি সহবত শিখিয়েছিলে আমাদের। কিন্তু তুমি ভুল জানতে মা। এ ঘটনার সময় আমার সেসব তালিম একেবারেই কাজে লাগেনি। আদালতে আমাকে এক ঠাণ্ডা মাথার খুনি হিসেবে পেশ করা হয়। কিন্তু আমি চোখের পানি ফেলিনি। অভিযোগও করিনি। আমি কাঁদিনি, কারণ আইনের প্রতি আমার অটুট আস্থা ছিল। আচ্ছা মা, আমি তো কোনো দিন একটা মশাও মারিনি। সেই আমিই নাকি মাথা খাটিয়ে মানুষ খুন করেছি। সেই বিচারকের হাত থেকে সুবিচার পাওয়ার আশা অতি বড় আশাবাদীও করতে পারে কি?’তবে রেহানে এ-ও জানত ‘মৃত্যুতেই সব শেষ হয়ে যায় না’। তাই তো মাকে চিঠির শেষে লিখেছে:’এবার আমার অন্তিম ইচ্ছা বলি শোনো। কেঁদো না মা, এখন শোকের সময় নয়। আমায় ফাঁসি দেওয়ার পর আমার চোখ, কিডনি, হৃদযন্ত্র, হাড় আর যা কিছু দরকার যেন অন্য কারও জীবন রক্ষা করতে কাজে লাগানো হয়। তবে যিনিই এসব পাবেন, কখনোই যেন আমার নাম না জানেন। আমি চাই না এর জন্য আমার সমাধিতে কেউ ফুল রেখে আসুক। এমনকি তুমিও না। তুমি কান্নায় ভেঙে পোড়ো না মা। বরং আমার দুঃখের দিনগুলো হাওয়ায় ভাসিয়ে দিও। এ পৃথিবী আমাকে ভালোবাসেনি মা। তবে সৃষ্টিকর্তার এজলাসে আমি সুবিচার পাবই পাব’।তবে রেহানেদের ওপর অত্যাচার এই ৪ অক্টোবর ২০২০-তেও শেষ হয় না।অবাক হই যখন ফেসবুক নামক আজব চিড়িয়াখানার কেউ কেউ বলেন, ধর্ষন ও যৌনতা নাকি সমার্থক! এবং তা বলেন তথাকথিত কোনও শিক্ষিত মহিলা! বলেন, ধর্ষকের বিচার চাওয়া মানে সেক্সকে বড়ো করে দেখা!তাই নাকি? আমরা জানি যৌনক্রীড়ায় দু’জন মানুষের কমবেশি ভূমিকা থাকে।যাকে ‘সেক্স’ বলি তা একতরফা সম্ভব-ই নয়।সমাজতাত্ত্বিক আন্দ্রিয়া ডরকিনের ভাষায়:’ধর্ষণ কোন দুর্ঘটনা নয়, কোন ভুল নয়। পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে যৌনতার সংজ্ঞা হল ধর্ষণ। যতদিন পর্যন্ত এই সংজ্ঞা বহাল থাকবে, ততদিন পর্যন্ত যৌন আক্রমণকারী হিসেবে পুরুষ এবং তার শিকার হিসেবে চিহ্নিত হবে নারী। এই সংস্কৃতিকে যারা স্বাভাবিক মনে করে, তারা ঠান্ডা মাথায় প্রতিদিন ধর্ষণ চালিয়ে যায়।’বিখ্যাত নারীবাদী ম্যাগাজিন সিজ এর সম্পাদক রবিন মরগ্যানের সংজ্ঞা অনুযায়ী:‘যে যৌন সম্পর্কটির উদ্যোক্তা নারী নয়, নারীর সত্যিকার যৌনইচ্ছে থেকে যেটি ঘটে না, সেই যৌন সম্পর্কটি ঘটা মানেই ধর্ষণ ঘটা।’ মরগ্যান আরও বলেছেন:’রেপ ইজ দ্য পারফেক্টেড অ্যাক্ট অব মেইল সেক্সুয়ালিটি ইন এ পেট্রিআর্কাল কালচার। ইট ইজ দ্য আলটিমেট মেটাফর ফর ডমিনেশন, ভায়োলেন্স, সাবজুগেশন অ্যন্ড পজেশন।’তসলিমা নাসরিন পরিষ্কার বলেছেন:’ধর্ষণ কোনো যৌনতার ব্যাপার নয়, ধর্ষণ হচ্ছে পুরুষের নিজেকে বড়ো ভাবার ব্যাপার, পুরুষের অযথা অহঙ্কার এবং নারীবিদ্বেষীর প্রকাশ’!হে মহোদয়/মহোদয়া আপনারা হল্লা করুন ফেসবুকে আর প্রতি ১৬ মিনিটে ১ টি করে ধর্ষণ হয়ে যাক!

লেখক: গৌতম মিত্র