কামাল চৌধুরীর তিনটি কবিতা

278

যুদ্ধশিশু
মা-কে খুঁজছে যুদ্ধশিশু। মা এখনো কুয়াশার মুখ
অভিশপ্ত জন্ম-দাগ মুছে ফেলতে পারে না, তাই
পৃথিবীতে কত সন্তান মা-কে খুঁজতে আসে
প্রতিটি যুদ্ধের শেষে রোদ ঠিকই ওঠে, বৃষ্টিও হয়
রক্তের দাগও একদিন শুকায়
অনেক সত্য তবু অপ্রকাশ্য থাকে, থাকতে হয়
মাতৃসদন থেকে বেঁচে যাওয়া কেউ কেউ
দুই যুগ তিন যুগ বহু যুগ পরও
অনেক প্রশ্ন নিয়ে বারবার ফিরে আসে
মায়ের অপমান, লজ্জা মুছে দিতে চায়।

মা হয়তো দূর আকাশে ফুটে থাকা দুঃখিত তারা
হয়তোবা অন্য কোথাও, পাতার আড়ালে মুখ ঢাকা
এখনও পালাচ্ছে যুদ্ধ-মাতা
সেই ভয়, লোক লজ্জা, সেই ঘৃণা, পাপ
সন্তানের প্রশ্নের মুখে রক্ত ঝরছে পলাতক পায়ে
দেখা যায় না সেই রক্ত। শুধু, তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে
আত্ম-পরিচয়
দুই যুগ তিন যুগ বহু যুগ পরও
ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে বঙ্গোপসাগরের তীরে

সেই তীরে অনেক মা, অনেক সন্তান
যুদ্ধশিশুরা তবু কারো সন্তান নয়।)

কারণ আমরা ফিরছি
লামাদের মতো মুণ্ডিত মাথা নিয়ে বাড়ি ফিরছে অচেনা রাত
সন্ধ্যার দ্রুততায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে জেতবন। শ্রমণের ভিক্ষার ঝুলিতে
যে পরিমাণ আড়াল ছিল অথবা নির্বাণের জন্য তোমার অসামান্য দান
হে অগ্রশ্রাবিকা, দ্যাখো, সেখানেও শীতের চিৎকার!
তবে কি তোমারও পাত্রে আহার্য অবশিষ্ট নেই? কেবল চিৎকার?
আমাদের গন্তব্যের মুখে
এইভাবে ফাঁকা হয়ে যাবে পান্থশালা?
যেদিকে প্রশ্ন করি—দেখি, যৌথ খামারের পাশে অনিশ্চিত
ভবঘুরে অভিজ্ঞতা
শূন্যতার পাহারায়
যে প্রশ্ন মৃত্যুহীন রাতজাগা অপ্রাপ্তির পাপে তাকে আজ
বাড়ি ফিরতে বলি
বাড়িটা কোথায়? বস্তুত, এ প্রশ্নও বাউলতত্ত্ব–কোন সমাধান নেই,
তবু ছেঁউড়িয়া থেকে ঝুঁটিবাঁধা নগরবাউলের আখড়ায়
ঘুরে ঘুরে সমীকরণের মাঠে
মহাবয়ানের জটিল গণিত এসে গেছে।
আপাতত সমাধান নয়। আমাদের মুণ্ডিত মাথা ভিজতে থাকবে
কারণ আমরা কুয়াশা ভালোবাসি
কারণ আমাদের জানা হয় নাই পাতা ঝরে যাওয়ার শব্দে
মৌনব্রত ভেঙে যাবে কি না
বসন্তের অনুগামী হওয়ার জন্য নির্জন মহাকাব্যের কতোটা
কোলাহল প্রয়োজন
কত রূপকথা, লোকশ্রুতি
আমাদের জানা হয় নাই, যে রাত্রি আহার্য বিরত
সেখানে কড়া নাড়ার শব্দে কেউ দরোজা খুললে
অসংযমী চাদরের নিচে উন্মাদ হয়ে যাবে কি না পান্থশালার ঘোড়া
আমরা হয়তো ঘোড়ার পিঠেই উঠবো। আমাদের গন্তব্যের মুখে
আবারও ফাঁকা হয়ে যাবে পান্থশালা
কারণ আমরা ফিরছি—কারণ আমরা এখনো জানি না
ফিরবো কোথায়?

গোধূলি
যে লেখে সমুদ্র , আমি তার সামান্য গোধূলি
বালি ও ফেনার তীরে
বসে থাকা ব্যাকুল ঝিনুক
নিজের ছায়ার পাশে হেঁটে এসে এক বুক জলে
এ শহর ডুবে যাবে,
গোধূলিতে আমাদের এমন অসুখ!