বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আলো আনা এক প্রাণ পুরুষ

428

প্রাক-পর্ব…

১৮৯৫ সালের ২৮শে ডিসেম্বর ফ্রান্সের লুই ল্যুমিয়ের আর অগাস্ত ল্যুমিয়ের যখন প্যারিসের গ্রান্ড ক্যাফেতে চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী করেন তখন গোটা বিশ্ব তাক লেগে যায়। মানুষের ধারণাই ছিলো না তারা পর্দায় এমনভাবে ছুটন্ত মানুষজন, গাড়ী-ঘোড়া আর দৃশ্য দেখবে। লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের সেই প্রদর্শনী ছিল পৃথিবীর বুকে প্রথম আনুষ্ঠানিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। ফ্রান্সের সেই প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মাত্র দুই বছরের মধ্যে ঢাকায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করেন জনৈক ইংরেজ সাহের মিঃ স্টিফেনস। আর বিশ্ব চলচ্চিত্র যাত্রার মাত্র তিন বছরের মধ্যেই ভারতবর্ষে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ ভাবনায় এগিয়ে আসেন আমাদের ঢাকার মানিকগঞ্জের বকজুরী গ্রামের হীরালাল সেন। ১৮৯৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন “রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানী”। ১৯০৩ সালে ভারত উপমহাদেশে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি এক নতুন যুগের সূচনা করেন। ভারত উপমহাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণে পথিকৃত হীরালাল সেন ঢাকার সন্তান হলেও তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র তিনি নির্মাণ করেন সেই সময়ের ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতায়।

যাত্রা শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই চলচ্চিত্র হয়ে উঠে অন্যতম এক প্রচার, বিনোদন আর অর্থ উপার্জনের মাধ্যম। পৃথিবীর বড় বড় শহরগুলোতে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। বোম্বে ও কলকাতাকে ঘিরে এই উপমহাদেশ এগুতে থাকে। কিন্তু যে ঢাকার এক সন্তানের হাত ধরে এই উপমহাদেশে চলচ্চিত্র হাঁটতে শুরু করে সেই ঢাকা প্রায় অর্ধ শতাব্দী একেবারে অকর্ষিত থেকে যায় চলচ্চিত্র যাত্রায়। 

গোটা বিশ্বে এমনকি কলকাতায় চলচ্চিত্র যখন পূর্ণতার পথে এগিয়ে চলেছে পূর্ণ দমে তখন অর্থাৎ ১৯২৭ সালে ঢাকার নবাব বাড়ীর কয়েকজন সংস্কৃতিমনা ছেলে একেবারে সৌখিনতার বশে বানিয়ে ফেলে স্বল্পধৈর্ঘ্যের ছবি “সুকুমারী”। পরিচালক ছিলেন অম্বুজ গুপ্ত। এ ছবির সফলতার পর “সুকুমারী”র সদস্যরাই ১৯৩১ সালে পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ‘ দ্য লাস্ট কিস’ নির্মাণ করলেন। ১২ রীলের এই নির্বাক ছবিটির পরিচালকও ছিলেন জগন্নাথ কলেজের শরীর চর্চার প্রশিক্ষক ও নামকরা নাট্য পরিচালক অম্বুজ গুপ্ত। সেই বছরের শেষের দিকে ঢাকার সেই সময়ের ‘মুকুল’ হলে ছবিটি মুক্তি দেয়া হয়। এই ছবির উদ্বোধন করেন সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ও প্রথিতযশা ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার।

বিশ্ব চলচ্চিত্র তখন অন্যরকম এক মহা গতিতে এগিয়ে চলেছে। পৃথিবীর বিখ্যাত বিখ্যাত ক্ল্যাসিক সব ছবি নির্মাণ হতে শুরু হয়েছে। ১৯১৭ সালের  মহান রুশ বিপ্লবের পর  মহামতি লেলিন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য যে অনুপ্রেরণার আহ্বান জানিয়ে কুলেশভ, পুদোভকিন আর আইজেনস্টাইনের দলকে জাগিয়ে তুলেছিলেন আর রাশিয়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণ অবকাঠামো গড়ে তুলেছিলেন তার ফসল ফলাতে শুরু করেছে, সেই সময়ও অবকাঠামোগত অনুপস্থিতির জন্য ঢাকায় তেমন কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় নি। “সুকুমারী” ও “দ্য লাস্ট কিস”এর শুটিং ঢাকাতে হলেও এর কারিগরী এবং শুটিং সরঞ্জামের যাবতীয় জিনিসপত্র আনা হয়েছিলো কলকাতা থেকে।

১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের সেক্রেটারী জেনারেল কায়েদে আজম জিন্নাহ দশ দিনের সফরে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় আসেন। মিঃ জিন্নাহর এই ঐতিহাসিক সফরকে স্মৃতিবন্দী করে রাখার জন্য সরকারী উদ্যেগে একটি প্রামাণ্যচিত্র করার উদ্যেগ গ্রহণ করা হয়। ঢাকার সন্তান ও ঢাকা বেতার কর্মী নাজির আহমেদকে এ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের যাবতীয় জিনিসপত্র কলকাতার অরোরা ফিল্ম স্টুডিও থেকে এনে নাজির আহমেদ সেই দশ দিনের শুটিং এ নির্মাণ করেন “ইন আওয়ার মিডস্ট”। পরে ১৯৫৪ সালে নাজির আহমেদ ঢাকার এক রাজমিস্ত্রীর দুঃখময় জীবন কাহিনী নিয়ে তৈরী করলেন আরেকটি প্রামাণ্যচিত্র ‘সালামত”। উল্লেখ্য, এই ছবি নির্মাণেরও যাবতীয় জিনিসপত্র আনা হয় কলকাতা থেকে।

নির্মাণ পর্ব …

চলচ্চিত্র নির্মাণ যাত্রার পঞ্চাশ বছরের বেশী সময় পেরিয়ে গেলেও তখনো ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনো ধরনের সামান্যটুকু অবকাঠামো গড়ে উঠেনি। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার সচিবালয়ে পূর্ববংগ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিচালক ড. আব্দুস সাদেক স্থানীয় সংস্কৃতিসেবী, চলচ্চিত্র পরিবেশক ও প্রদর্শকদের এক সভা আহ্বান করেন। ড. সাদেক পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাথে জড়িত ছিলেন, ফলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের মনোভাব ভালোভাবে জানতেন। তিনি উক্ত সভায় চলচ্চিত্রে পূর্ব বংগের অনগ্রসরতার কারণ তুলে ধরে তার সমাধানের ইংগিত দেন। পূর্ব বংগকে স্বাবলম্বী করার জন্যই তিনি প্রদেশে চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি প্রদেশে ৯২টি প্রেক্ষাগৃহে বিদেশী ছবির বদলে যাতে স্থানীয় ছবি যেন প্রদর্শিত হয় সেজন্য ছবি তৈরীর কথা বলেন। ড. সাদেকের এই আহ্বানে সেই সভায় উপস্থিত এক অবাঙ্গালী চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী ফজলে দোসানী বলেন, এখানকার আবহাওয়া খারাপ, আদ্রতা বেশী। কাজেই এখানে ছবি তৈরী সম্ভব নয়। দোসানীর বক্তব্যকে সেদিন চ্যালেঞ্জ করে     সেই সভায় উপস্থিত তেজস্বী বাঙ্গালী নাট্যকার আব্দুল জব্বার খান বলেছিলেন, ‘ কোলকাতায় যদি ছবি হতে পারে তবে ঢাকায় হবে না কেনো? আমি প্রমথেশ বড়ুয়াকে ছবির শুটিং করতে দেখেছি। কোলকাতার বেশ কয়েকজন ছবির নির্মাতাও এখানে এসে ছবির শুটিং করেছেন। তাহলে এখানে ছবির শুটিং  কেনো হবে না। মিঃ দোসানী আপনি জেনে রাখুন, আগামী এক বছরের মধ্যে যদি কেউ ছবি না করেন তবে আমি জব্বার খানই তা বানিয়ে প্রমাণ করবো।” বলা যায় এই চ্যালেঞ্জের জবাব থেকেই পরের বছর আব্দুল জব্বার খান শুরু করেন বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম পূর্ণাংগ সবাক বাংলা চলচ্চিত্র “মুখ ও মুখোশ” এর কাজ। ১৯৫৬ সালের ৩রা আগস্ট আব্দুল জব্বার খানের “মুখ ও মুখোশ” মুক্তি পায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জে। এ ছবির উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।

১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর জনসংযোগ বিভাগের অধীনে সরকারী প্রচারচিত্র তৈরীর জন্য ঢাকার তেজগাঁওস্থ বি জি প্রেসে স্থাপিত হয় প্রাদেশিক সরকারের চলচ্চিত্র শাখা। পূর্ণাংগ চলচ্চিত্র নির্মাণের মত কোনো স্টুডিও ল্যাবরেটরি তখন ঢাকায় ছিলো না। বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনের পর এখানে পূর্ণাংগ ফিল্ম স্টুডিও স্থাপনের দাবি ক্রমশই জোরদার হয়। অন্যদিকে অস্থানীয় চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীরা কখনোই চাইতো না ঢাকায় চিত্রশিল্প গড়ে উঠুক। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের পতন হলে যুক্তফ্রন্ট সরকার পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসে। শেখ মুজিবুর রহমান হন  শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী। 

ঢাকায় একটি স্থায়ী ফিল্ম স্টুডিও স্থাপনের ব্যাপারে মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের  সাথে আলোচনা করেন আব্দুল জব্বার খান, ড. আব্দুস সাদেক, নূরুজ্জামান প্রমুখ। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁদেরকে স্টুডিও স্থাপনের ব্যাপারে একটি পরিকল্পনা করতে বলেন। আব্দুল জব্বার খান ও তৎকালীন প্রাদেশিক সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) আবুল কালাম শামসুদ্দীন যৌথভাবে সরকারের কাছে একটি পরিকল্পনা পেশ করেন।  সেই পরিকল্পনার প্রেক্ষিতে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় ১৯৫৫ সালের শেষের দিকে ইটালীর একটি চলচ্চিত্র মিশন ঢাকায় আসে। ঐ মিশন স্টুডিও স্থাপনের ব্যাপারে সরকারকে পরামর্শ দেয়। ১৯৫৬ সালে শিল্প ও  বাণিজ্য মন্ত্রীর উদ্যেগে সরকার প্রদেশে চলচ্চিত্র শিল্প প্রসারের লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে।

 ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে ওখানে একটি সংস্থা গঠনের জন্য এক কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যেগ নেয়। এই অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য সম পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের দাবি তোলেন প্রাদেশিক চলচ্চিত্র বিভাগের প্রধান নাজীর আহমেদ। 

নাজীর আহমেদ তখন শিল্প দপ্তরের সচিব আসগর আলী সহ শিল্প দপ্তরের উপ-সচিব আবুল খায়েরের মাধ্যমে বিষয়টি তৎকালীন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের নজরে আনেন। শেখ মুজিবুর রহমান বিষয়টি শুনে অতি সত্ত্বর চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠার বিলের একটি খসড়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরী করার নির্দেশ দেন। তখন প্রাদেশিক আইন পরিষদের অধিবেশন শেষ হতে মাত্র দু’দিন বাকি ছিলো। এই অবস্থায় নাজীর আহমেদ ও আবুল খায়ের এফডিসি বিলের কাগজপত্র তৈরী করেন।

১৯৫৭ সালের ৩রা এপ্রিল প্রাদেশিক আইন পরিষদের অধিবেশনের শেষ দিন সকালে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা বিল উত্থাপন করেন। সেদিন পরিষদের উপস্থিত ছিলেন ১১ জন মন্ত্রী ও ২৫০ জন সদস্য আর স্পিকার ছিলেন আব্দুল হাকিম। বিল উত্থাপনের পর প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য আব্দুল মতিন, ইমদাদ আলী ও মনীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য সামান্য সংশোধনী আনেন। সংশোধনীর পর বিলটি বিনা বাধায় আইন পরিষদের পাশ হয়। উল্লেখ্য, তখন প্রদেশের গভর্ণর ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক আর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আতাউর রহমান খান। 

Dacca Gazette এর অতিরিক্ত সংখ্যা Pt. I.P.P 1383 এ প্রকাশিত সেই বিলের বিষয়টি নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হয়েছে ; 

পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ এর ১৯৫৭ সালের প্রথম অধিবেশন। তারিখ ২৭ মার্চ। “The East Pakistan Film Development Corporation Bill, 1957” পেশ হল এভাবে।

ÒMr SHEIKH MUJIBAR RAHMAN: Sir, I beg to proceed to introduce the East Pakistan Film Development Corporation Bill, 1957.”

ঢাকা, ৩ এপ্রিল, ১৯৫৭, বুধবার পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের স্পীকার জনাব আব্দুল হাকিম এর সভাপতিত্বে ১৯৫৭ সালে প্রথম অধিবেশনের শেষ কার্য্যদিবসের কার্যক্রম শুরু হল। শুরুতেই মূখ্যমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খান বললেন ”Sir, today is the last day of the session and we have some important work at our disposal. There are two or three Bills which are very important and one for instance the Bengal Academy Bill……… which I introduced yesterday and the Film Development Corporation Bill which is also very important.”. 

এর পর ফ্লোর নেন বিরোধিদলীয় নেতা জনাব আবু হোসেইন সরকার। So far as the Film Development Corporation Bills is concerned there may not be any controversy.  

আরো কয়েকজন বক্তার পর, ফ্লোর নেন বিল উত্থাপনকারী মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বললেন, ÒSir, I beg to move that the East Pakistan Film Development Corporation Bill, 1957 be taken to consideration.”

বিলটি উত্থাপনের পরপরই ফ্লোর নেন বিরোধী দলীয় সদস্য জনাব মো: আব্দুল মতিন বলেন, It is very good thing that the Government has brought this Bill before the House for the improvement of film Industry in East Pakistan which is crying need of the day” তিনি কতিপয় সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করেন। পরিষদের সদস্য জনাব মো: এমদাদ আলী ও জনাব মুনিন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য্য আরো কয়েকটি সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করেন। বিল উত্থাপনকারী মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান গ্রহণ করলেন সংশোধনী প্রস্তাবগুলো। ফ্লোর নিলেন শিল্প, বাণিজ্য ও শ্রম মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। বললেন, , Sir, I beg to move that the East Pakistan Film Development Corporation Bill, 1957, as settled in the Assembly be passed”  সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি পাশ হয়ে গেল। আইনটি ১৯ জুন, ১৯৫৭ থেকে কার্যকর হয়েছে । 

নতুন বিলের ২৪ ধারা অনুযায়ী চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার প্রধানতম দায়িত্ব ও উদ্দেশ্যাবলী ছিলো ;

ক) চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং স্টুডিও প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানীকে ঋণদান।

খ) ফিল্ম স্টুডিও নির্মাণের জন্য কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে ঋণদান।

গ) নিজেদের স্টুডিও স্থাপন এবং চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ভাড়ার বিনিময়ে এসব স্টুডিও ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়া।

ঘ) চলচ্চিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট গবেষণা স্কিমসমূহ চলচ্চিত্র শিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নয়নের জন্যে স্কিম প্রণয়ন ও সরকারে কাছে পেশ করা।

ঙ) চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে বিতরণের উদ্দেশ্যে ছবি তৈরি ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য ঋণদান। 

প্রাথমিক পর্যায়ে এফডিসি (ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন)’র প্রশাসনিক দপ্তর চালু করা হয় বায়তুল মোকারম মসজিদের পেছন দিকে স্কাউট ভবনে (বর্তমানে লুপ্ত)। পরে সেগুনবাগিচার এক বাড়ীতে। প্রাদেশিক তথ্য বিভাগের চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য তেজগাঁও রেল লাইনের পাশে যে শুটিং ফ্লোর ও ল্যাব ভবন (বর্তমানে যেখানে বিএফডিসি অবস্থিত) তৈরি হচ্ছিল সে এলাকাটি নবগঠিত সংস্থার অধীনে ন্যস্ত করা হয়। প্রাদেশিক জনসংযোগ বিভাগের চলচ্চিত্র শাখার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এফডিসির অধীনে নেয়া হয়। ১৯৫৮ সালে এফডিসি সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করে। ১৯৫৯ সালে এফডিসি’র প্রশাসনিক ভবন বর্তমান স্থানে নেয়া হয়। 

শেষ পর্ব…

১৯৫৭ সালের ৩রা এপ্রিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৩৭ বছর বয়স্ক শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী  শেখ মুজিবুর রহমান যে অদ্ভুত দূরদর্শিতায় গণ পরিষদ অধিবেশনের একেবারে শেষ দিনে এফডিসি’ বিল পাশ করিয়ে এনে বাংলার চলচ্চিত্রপ্রেমীদের যে স্বপ্ন উপহার দিয়েছিলেন, তার হাত ধরেই তার কয়েক বছরের মধ্যেই  বাংলার চলচ্চিত্র এক ঈর্ষণীয় উচ্চতায় উঠে আসে। তৈরী হতে থাকে  চলচ্চিত্র নির্মাতা সালাউদ্দিন, এ জে কারদার, জহির রায়হানের হাত দিয়ে কালজয়ী সব চলচ্চিত্র। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা আর প্রচেষ্টায় সেদিন সেই বিলটি পাশ না হলে, বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনভাবেই চলচ্চিত্রের অবকাঠামো তৈরী হওয়া সম্ভব ছিল না। তার প্রধানতম কারণ, গণ পরিষদের সেই শেষ দিনের পরেই আর গণ পরিষদের অধিবেশন বসেনি, গণ পরিষদ ভেঙ্গে দেয়া হয় এবং পরর্বতী সাধারণ নির্বাচন হওয়ার পূর্বেই পাকিস্তানে চলে আসে সামরিক শাসন যেখানে গণ মানুষের দাবী-দাওয়া আর আশা-প্রত্যাশার কোন মূল্য ছিল না। 

যৌবনের মন্ত্রী খোলা চোখে দেখেছিলেন চলচ্চিত্রের প্রশস্ত পথের স্বরূপ, তাঁর সেই দেখাটা ঝকঝকে আর স্পষ্ট ছিলো বলেই গণ পরিষদ অধিবেশনের শেষ দিনে তিনি চলচ্চিত্র উন্নয়ন বিলটি পাশ করাতে পেরেছিলেন। তিনি সেই বিলটি পাশ করিয়েছিলেন বলেই  তৈরী হতে থাকে আমাদের মাতৃভূমিতে চলচ্চিত্র শিল্পের বলিষ্ঠ অবকাঠামো। ১৯৫৭ সালের ৩রা এপ্রিল বাংলার চলচ্চিত্রে আলো আনা প্রাণ পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই বিলটি তাঁর স্বাপ্নিক দূরদর্শিতায় এত স্বল্প সময়ের মধ্যে পাশ  করিয়ে না নিলে হয়তো জহির রায়হান আর অন্যান্য স্বপ্ন দেখানো চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্ম এমন শিল্পী হিসেবে নাও হতে পারতো। আর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্প হয়তো সেই অন্ধকার অকর্ষিত জায়গাতেই আরো অনেক দশক ঘুরপাক খেয়ে চলতো।


মনিস রফিক

সাধারণ সম্পাদক

টরন্টো ফিল্ম ফোরাম, টরন্টো, কানাডা 

কৃতজ্ঞতাঃ

১। অনুপম হায়াr , বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন, ঢাকা, ১৯৮৭ 

২। Dacca Gazette এর অতিরিক্ত সংখ্যা Pt. I.P.P 1383 

ছবি ক্যাপশন

১। ১৯৫৪ সালের ১৫ই মে পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐক্যফ্রন্ট মন্ত্রী সভায় একজন মন্ত্রী হিসেবে শপথ বাক্য পাঠ করছেন। 

২। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (BFDC )’র প্রধান ফটক।