আলোকপাত- ১ (পথের পাঁচালী)

414

পথের পাঁচালী (১৯২৯) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৪-১৯৫০) প্রথম, কালোত্তীর্ণ ও সর্বাধিক জনপ্রিয় উপন্যাস। সাময়িক পত্র মাসিক ‘বিচিত্রা’য় ১৩৩৫ সালের আষাঢ় সংখ্যা থেকে পথের পাঁচালী ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। পরবর্তীতে সজনীকান্ত দাসের রঞ্জন প্রকাশনালয় থেকে ১৯২৯ সালের অক্টোবর মাসে পথের পাঁচালী পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়। উৎসর্গ করা হয়েছিল, ‘পিতৃদেব’ কে। উপন্যাসটি তিনটি পর্বে বিভক্ত: বল্লালী বালাই, আম- আঁটির ভেঁপু, অক্রুর সংবাদ। বিভূতিভূষনের আত্মজীবনী তৃণাঙ্কুর থেকে আমরা জানতে পারি, উপন্যাসটি লেখার আগে তিনি অন্তত পাঁচ বছর ভেবেছেন। পথের পাচাঁলী প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালীন ভিন্নধারার একটি উপন্যাস।

ডঃ সৌমিত্র শেখরের একটি মূল্যায়ন,”বিভূতিভূষণ দরিদ্র চরিত্রগুলোর সমাবেশ ঘটিয়ে কোন দুঃখগাঁথা তৈরি করতে চান নি। অথবা চান নি প্রলেতারিয়েতের শ্রেণি বিপ্লব ঘটাতে। তিনি যুগের অস্থিরতায় না জড়িয়ে আবহমানকালের চিরস্থায়ী, চিরসাক্ষী এবং একটি পরিপূর্ণ সত্তা নিসর্গ প্রকৃতিকে অবলম্বন করলেন এ উপন্যাসে।”

বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র হরিহর রায় ও তার স্ত্রী সর্ব্বজয়া, দুই সন্তান দুর্গা ও অপু ওদের পিসী ইন্দির ঠাকরুন এবং কতিপয় গ্রাম্য চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে বল্লালী বালাই ও আম আঁটির ভেঁপুতে। তাঁদের জীবনযাত্রা নিয়েই গড়ে উঠেছে এ উপন্যাসের প্রথমিকা।দুর্গার মৃত্যুর পর গ্রাম ছেড়ে একসময় কাশীতে চলে যায় অপুরা। অক্রুর সংবাদে এসে যোগ হয়েছে অপর প্রধান চরিত্র, লীলা। অনেক বলেন এটি বিভূতিভূষণের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। মূলত অপু চরিত্রটিই পথের পাঁচালীর প্রধান চরিত্র। এ উপন্যাসে ফুটে উঠেছে একটি কাল ও… কিছু জীবনের আন্তরিক ও মর্মভেদী চিত্রণ।

ছোটবেলায় প্রথম পড়ি ‘পথের পাঁচালী’।আমি যে স্কুলে পড়তাম,সেটারই কলেজ শাখায় পড়ায় আমার মা। প্রিন্সিপাল ম্যাম,মামণি আর আমি একসাথে স্কুলের মাইক্রোবাসে মাঝে মাঝে আসতাম। তিনি আমাদের বাসায় নামিয়ে দিয়ে যেতেন। ক্লাস ফাইভের পিচ্চি পথের পাঁচালী পুরোটা পড়ে শেষ করেছে, এইটা শুনে ম্যাম খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন সেদিন। আমার মনে আছে ওনার বিস্মিত মুখটা দেখে আমার ভালো লাগছিলো। [‘খুব বড় একটা কাজ করেছি’ টাইপ ভালো লাগা]

পথের পাঁচালীর ব্যাপারটি ছিল এই ‘প্রকৃতি’, নিসর্গ প্রকৃতি আর ‘মানুষ’…সাধারণ মানুষ। উদ্ভট কোন কল্পলোক নয় একান্ত বাস্তব জগৎকে নিয়েই ‘পথের পাঁচালী’। তখন যে খুব বুঝতাম এমন না,স্রেফ ‘পড়ছি’ এই আনন্দ নিয়েই পড়তাম।

ওইটেই একটা আনন্দ ছিলো, নিজেকে অন্য কেউ মনে করা, আমি হয়ত তখন একটা পল্লীবালিকাই হয়ে যেতাম…পিসিমাদের শেখানো ছড়া গাইছে,”হলুদ বনে বনে, নাকছাবিটি হারিয়ে গেছে সুখ নেইকো মনে।”

রেলের থার্ড ক্লাস বগির বাদুর ঝোলা লোকটাও যে মহিমাময় চরিত্র হতে পারে, কিংবা গ্রামের পথে ছিন্ন পোশাক পড়া উস্কুখুস্কু চুলের মেয়েটি অপূর্ব দ্যোতনায়,গভীর করুনায় হৃদয়কে সিক্ত করে দিতে পারে সেটা কেমনে বুঝতাম এই উপন্যাসটি না পড়লে? “এই বন তার শ্যামলতা নবীন স্পর্শটুকু তাহার আর দিদির মনে বুলাইয়া দিয়াছিলো।”– নোনাফল কিংবা বৈঁচির রস আস্বাদন আমি কোনদিনও করি নি, কিংবা প্রবল ঝড়ের রাতে চালের ফুটো দিয়ে পানিও পড়ে নি আমার ঘুমন্ত দেহে। আতুরী বুড়ি ছিল না কিংবা ইন্দিরা ঠাকরুনও ছিলো না আধুনিক ঢাকা নগরীতে আমার চারিধারে…কোনখানে। বিংশ শতকের শেষ দশকে আমার জন্ম।। তবুও আমি-ই নিশ্চিন্দিপুরের একটা অংশ ছিলাম। এইটাই হলো বিভূতিভূষনের সফলতা, সবাই নিজেকে খুঁজে পায় তার লেখায়।

আমার কাছে পথের পাঁচালীর সাথে মিল মিল লাগে জীবনানন্দের কবিতার… নিসর্গ…!

GL100331093

রবিবাবুর মূল্যায়ন ছিলো এ উপন্যাস সম্পর্কে,”আখ্যানটি অত্যন্ত দেশি। এই বইটিতে পেয়েচি যথার্থ গল্পের স্বাদ। এর থেকে শিক্ষা হয়নি কিছুই। দেখা হয়েছে অনেক যা পূর্বে এমন করে দেখিনি। …..আধুনিক অভিজ্ঞতার পরিবেষ্টণ থেকে দূরে…” তবে তিনিও স্বীকার করেছেন, “লেখার গুন এই যে, মনে হয় খুব খাঁটি উঁচুদরের কথায় মন ভোলাবার জন্য সস্তাদরের রাঙতার সাজ পড়াবার চেষ্টা নাই।বইখানা দাঁড়িয়ে রয়েছে আপন সত্যের জোরে।”

নিষ্পাপ এক পল্লীবালকের ছবি ত আমার মনে গভীর ছায়া ফেলেছিলো। অপু যে প্রকৃতির সন্তান।’অপু’…”সব ইট সিমেন্টের কান্ড কারখানায় তাহার হাফ ধরে,কেমন যেন দম আটকাইয়া আসে…” “ওই আস্তাবলের মাথায় যে আকাশটা, ওরই ওপারে পুবদিকে বহুদুরে তাহাদের নিশ্চিন্দিপুর। আজ কতোদিন সে নিশ্চিন্দিপুর দেখে নাই তি…ন বৎসর! কতকাল! সে জানে নিশ্চিন্দিপুর তাহাকে দিনে-রাতে সবসময় ডাকে, শাঁখারীপুকুর ডাক দেয়, বাঁশবনটা ডাক দেয়, সোনাডাঙ্গার মাঠ ডাক দেয়, কদমতলার সাহেবের ঘাট ডাক দেয়….।এতদিনে তাহাদের সেখানে ইছামতীতে বর্ষার ঢল নামিয়াছে। ঘাটের পথে শিমুলতলায় জল উঠিয়াছে। ঝোপে ঝোপে নাটাকাঁটা, বনকলমির ফুল ধরিয়াছে। অপরাজিতার নীল ফুলে বনের মাথা ছাওয়া। বনের ধারে সে অপূর্ব মায়াময় বৈকালগুলি মিছামিছিই নামিবে চিরদিন।”

Slingshot!! Slingshot!!

এর জীবনের… অপুর ছেলেবেলা থেকে শুরু করে কাজলের [অপুর ছেলে] শৈশব পর্যন্ত আমরা দেখি অসামান্য একটা… কি জানি এটাকেই মনে হয় ‘উপখ্যান’ বলে।
ওই বায়োস্কোপ দেখার জন্য কী অতুগ্র আগ্রহ শিশু দুটির প্রাণে কিংবা…. চিনিবাস ময়রা বাড়ির সামনে দিয়ে খাবারে ডালা নিয়ে যায়, অপুর দিকে তাকিয়ে দুর্গার মন কেমন করে ওঠে, পয়সা যে নেই!কীভাবে কিনে দেবে ভাইটাকে?দুর্গার মৃত্যুর সময়টিতে আমারো চোখ শুকনো ছিল কি?

pather_panchali_20090729

সত্যজিৎ এ উপন্যাসটিকে নিয়ে চলচ্চিত্র বানিয়েছিলেন,অস্কার পেয়েছিলো সেটা।ওরই তৃতীয় পর্ব মানে ‘অপুর সংসার’ .. ওখানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যিনি অপুর ভূমিকায় অভিনয় করছিলেন…বন্ধুর সাথে রেললাইন দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে বলছেন,”আমি একটা উপন্যাস লিখবো।” তা কেমন উপন্যাস? “উপন্যাসের নায়ক,একটি বালক..পল্লীগাঁয়ে বেড়ে ওঠা একটি বালক।স্বাপ্নিক।….দরিদ্র গ্রামীন জীবনযাত্রায় বড় হওয়া একটি বালক।একসময় সে শহরে এল,কিছু লেখাপড়া শিখলো..তবুও তার দারিদ্র গেল না।সে বিরূপ শহুরে জীবনে নিত্য সংগ্রাম করছে… কিন্তু …কিন্তু বেঁচে থাকতে চাইছে,সে মহৎ কিছু করছে না….তার দারিদ্র যাচ্ছে না….তবুও সে বেঁচে থাকতে চাইছে হার না মেনে।”

কথাগুলো ঠিক এমনই ছিলো কি না জানি না।আমি স্মৃতি থেকে লিখলাম কেবল।কিন্তু মূল কথাটি হলো, ‘সে জীবন বিমুখ হচ্ছে না,সে বেঁচে থাকতে চাইছে’….

শেষের দিকে এসে পথ কথা বলেছিলো…জীবনের অনাস্বাদিত এক দিকের কথা গৃহবিচ্ছিন্ন বেদনা উচ্ছ্বসিত অপুর কাছে, “পথ আমার চলে গেল শুধুই সামনে…সামনে…দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে,সূর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে,জানা ছেড়ে অজানার পানে….মহাযুগ পার হয়ে যায় পথ আমার তখনও ফুরায় না…চলে চলে এগিয়েই চলে….।অনির্বান তার বীণা শোনে শুধু অনন্ত কাল আর অনন্ত আকাশ…চলো এগিয়ে যাই।”
এই এগিয়ে যাওয়াই তো জীবন!! পথের পাঁচালী আমাদের কাছে জীবনের আসল বার্তাটি পাঠিয়ে দিতে পেরেছিলো শব্দের বুননে।

‘পথের পাঁচালী’তে জীবনের এক অধ্যায়…… আরেক অধ্যায় দেখা যায়,’অপরাজিত’ তে।অপু জীবনের কাছে পরাজিত কোন চরিত্র নয়,এইটা সার্থক করেছে বিভূতিবাবুর কালজয়ী এই উপন্যাসটি।যারা এখনো পড়েন নি আহবান করছি পড়ে নেয়ার জন্য।